২০ অক্টোবর, ২০১৪

মেডিক্যাল এডমিশন টেস্ট ২০১৪

জেনেসিসঃ

সৃষ্টিকর্তার আদেশে সৃষ্টি হলেন প্রথম মানব এবং মানবী। ইসলাম ধর্ম অনুসারে যাদের নাম আদম এবং হাওয়া, এডাম এবং ইভ নাম তাদের ক্রিশ্চানধর্ম মতে। আর হিন্দুধর্ম অবলম্বনে তাঁদেরই নাম মনু এবং শতরূপা।

কিছু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো স্বর্গে বসবাসের জন্য করে। যেখানে তাদের জীবন হতো চির আনন্দময়, কোন রোগশোক, নিরানন্দ, হতাশা তাঁদেরকে স্পর্শ করতে পারতো না।

তাঁদের স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পতন হয় শয়তানের প্ররোচনায়, সৃষ্টিকর্তার নিষেধ করে দেয়া ইডেন বাগানের গন্ধম ফল খেতে গিয়ে। অতঃপর শুরু হয় তাঁদের এমন এক জীবনের যেখানে কষ্ট, রোগশোক আর হতাশা নিত্যসঙ্গী। (অরিজিনাল সিন / আদিমতম পাপ)

দিনগুলো ঘুরতেই মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা। সবার চোখের অগোচরে জীবন পাল্টে দেয়া একটি দিন। একটু খেয়াল করলে এর সাথে জেনেসিস আর আদিপাপের আবছা একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

শত অভিযোগ অপবাদ, কষ্ট আর হতাশা ভরা এক বিরামহীন ক্লান্তিময় জীবন মেডিকেল স্টুডেন্ট আর ডাক্তারদের। প্রবাদবাক্যে “কষ্টের ফল যেমন মধুর” বলা হয়, বাস্তবে সেটিও সবসময় ভাগ্যে জুটে না। গন্ধম ফলের মতোই অর্জনটা মিষ্টি মনে হয় শুধু ক্ষণিকের জন্যই।

তবুও কিছু ছেলেমেয়ে দুঃসাহস করে, বুড়োদের নিষেধ করে দেয়া এই গন্ধম ফল খেয়েই এই কঠিন জীবনে পা বাড়ায়। নিষেধ অমান্য করায় তাদের জন্য কোন অভিশাপ নয়, তাদের জন্য শুভকামনা।




কিছু সাহসী মানবমানবী স্বর্গচ্যুত না হলে বাকিদেরকে পৃথিবীতে স্বর্গের স্বাদ দিবে কে?

১০ অক্টোবর, ২০১৪

মানসিক স্বাস্থ্য দিবসঃ ১০ই অক্টোবর

আমাদের এক স্যারের সাইকিয়াট্রিতে পোস্টগ্রেজুয়েসন করার পরে পোস্টিং হল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের এনাটমি ডিপার্টমেন্টের লেকচারার হিসাবে। মেডিকেলে সাইকিয়াট্রি বিভাগ ছিল না তখন। সেই সময় কলেজের প্রথম বর্ষে আমাদের ক্লাসগুলো শুরু হয়েছে মাত্র। স্যার আমাদের আগ্রহের সাথেই এনাটমির হাড্ডিগুড্ডি পড়ান, ভিসেরা দেখান। আমরা পিছনে বসে হাসাহাসি করি, কই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নাকি আমাদের এনাটমির ক্লাস নেয়!

এবডমেন কার্ডে এসে ফিমেইল জেনিটাল অর্গান চ্যাপ্টারটা পড়ানোর দায়িত্ব স্যারের ভাগে পড়লো। এবারে সবার আড়ালে আবডালে হাসাহাসির পরিমানটা পর্বতপ্রমাণ হতে লাগলো। ক্লাসের মধ্যে প্রায়ই ছেলেমেয়ে সবার মিলিত কণ্ঠের “হাহা, হি হি” শব্দের হাসি শুনতে পাওয়া যায়। ভাইবা নিতে গিয়ে স্যারেরও মাঝেমাঝে হাসি চলে আসে। কি ওকওয়ার্ড অবস্থা। বছর ঘুরলো, প্রথম প্রফ পার করলাম। ভাবলাম এবার বুঝি সাইকির স্যার গেলেন নেটওয়ার্কের বাইরে।

বিধি বাম। ৩য় বর্ষে আমরা ক্লাস আর ওয়ার্ড শুরু করতে না করতেই কলেজে সাইকিয়াট্রি বিভাগ খুলে দেয়া হল। একমাত্র এসিসটেন্ট প্রফেসর হিসাবে স্যারেরই পদোন্নতি হল সেই বিভাগে। ক্লিনিকাল স্টুডেন্টদের সাইকিয়াট্রি বিভাগে প্লেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হল। কি যন্ত্রণা, এবার ঠিকই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাগলের চিকিৎসা নিয়ে শিখতে হবে!




ওয়ার্ডে কি সব অদ্ভুত সব রোগী, কথাবার্তা লাগাম ছাড়া। ৭ দিনের প্লেসমেন্ট ফাঁকিবাজি করে ২/৩দিন না গিয়ে কাটিয়ে দিলাম। স্যার আগ্রহ করে কথা বলতে গেলেই আমরা গল্পগুজব করে পাস কাটিয়ে যেতাম। পুরানো ছাত্র বলে স্যারও বেশী কঠিন হতে পারতেন না।

চতুর্থ বর্ষের প্লেসমেন্টে কোন সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড না পড়লেও সপ্তাহ দুয়েক পরপর কোন একদিন সাইকিয়াট্রি লেকচার ক্লাস পড়তো। ঘুমঘুম চোখে লেকচার শুনতে গিয়ে সবারই মনে হতো আমার কোন মানসিক রোগ আছে। কারো মনে হতো বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, কারো ডিপ্রেশন, কারোবা এন্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার।

ফাইনাল ইয়ারের সময়টা কেটে গেলো ধুমধাম করে। প্রফের আগে এসেসমেন্টের আগে শুনি মেডিসিনের সাইকিয়াট্রির ভাইবা বোর্ড থাকবে আলাদা। হায় হায়, প্রফের সময় একবারই পড়বো এই সাবজেক্ট ভেবে এটা কবেই রেখে দিয়েছিলাম বাকি বইয়ের তলায়। অল্প সময়ে মেডিসিনের একগাদা পড়ার ফাঁকে কোনমতে ঘণ্টা দুয়েক চোখ বুলালাম এন্ডেভার আর লেকচারের পাতায়, বিশাল সিলেবাস। শেষ হবে না ভেবে হাল ছেড়ে দিলাম প্রায়। ভাইবার হলে পুরনো সেই স্যার দেখি সিজোফ্রেনিয়ার এ বি সি ডি (Auditory Hallucination, Broadcasting of Thought, Controlled Thought, Delusion) পারতেই খুশী। এক স্যার, যাকে আমরা প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত ফেইস করে গেলাম।

ইন্টার্নীতে প্রথম সাইকিয়াট্রির প্রকোপটা অনুভব করলাম। এমিট্রিপটাইলিন, ক্লোনাজিপাম, ফ্লুপেন্টিক্সল+মেলিট্রাসিন ছাড়া কোন প্রেসক্রিপশন যেন সম্পূর্ণ হয় না, সেটা শুধু মেডিসিন স্পেশালিষ্টদের বেলাতেই। সাইকিয়াট্রির প্লেসমেন্টে আরও ট্রিটমেন্টের তো শেষ নাই। একটাই অনুধাবন হল, এদেশের মানুষ যত না শরীরের সমস্যায় ভোগে, তার থেকেও বেশী ভোগে মনের সমস্যায়। অভিজ্ঞতা থেকেই বলা, ডাক্তাররাও এর ব্যতিক্রম নয়।

সাইকিয়াট্রিস্টের কাজটা আমাদের দেশে খুব অমর্যাদাকর হিসাবে রয়ে গেছে অনেকের মনেই। আমেরিকায় বেতনের দিক থেকে ৩য় স্থানে থাকা এই জব হোল্ডারদের সমতুল্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে পরিচিত হন পাগলের ডাক্তার হিসাবে। তবুও দিন বদল চলছে, মানুষ এখন বুঝতে শিখছে। আমরাও এনাটমির সাইকিয়াট্রির হাসিঠাট্টার পর্যায় থেকে বুঝতে শিখে এর গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পারছি।

১০ অক্টোবর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। পরিবারে একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত সদস্য থাকলেই শুধু আমরা এর গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পারি। নিজের ভিতরেও যে কতো সমস্যাগুলোর বীজ বহন করে চলছি তা গোপনই থেকে যায়। শরীরের স্বাস্থ্যের সাথে মনের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই, এই কামনায়...

০১ অক্টোবর, ২০১৪

একজন ডাক্তারের মন মানসিকতার অন্তরাল থেকে...

ডিউটি রুমে বসে আছেন। হটাৎ ইন্টারকমে নার্সের ফোন। “ডক্টর, কেবিন ৪১৪-র রোগী খারাপ হয়ে গেছে, একটু দেখে যান।” স্টেথো আর বিপি হাতে কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। আগে থেকেই জানা বৃদ্ধের অবস্থা খারাপ, হাইয়ার সেন্টারগুলোতে রেফার করার পরেও রোগীর পার্টি অপারগতা জানিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চেয়েছে এখানেই।

বৃদ্ধের পাশে শুধু একজন মহিলা। একপলক রোগীকে দেখে অভিজ্ঞতাই জানিয়ে দিলো ডাক্তারকে, এই দেহ প্রাণহীন। তারপর শুধু নিয়মরক্ষার মতো পরীক্ষাগুলো করে গেলেন। শেষ করে ডেথ ডিক্লেয়ার করলেন ১.৪৫ মিনিটে। কথা শুনে পাশের মহিলা ফোঁস করে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুনলেন। এটাকি দীর্ঘদিন কষ্টে ভোগা মানুষটার মুক্তিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস নাকি বুকের গভীরে জমানো বেদনার প্রকাশ ডাক্তার বুঝতেই পারলেন না।

রোগীর ফাইল সিস্টারকে ডাক্তার রুমে পাঠাতে বলে ফিরতি পথে পা বাড়ালেন। দুই মুহূর্তের জন্য মনে প্রশ্ন এলো, আর কি কিছু করার ছিল রোগীর জন্য? ভিতর থেকে উত্তর আসলো, “না।”
এই স্বস্তিতে ডাক্তার আবার একটু পরেই ভুলে যাবেন বিষয়টি, মনে খুব একটা ছাপই ফেলবে না ব্যপারটা। এমন ঘটনা অনেকবার ঘটে গিয়েছে জীবনে। জীবন মরনের সেতুবন্ধনের পারাপারটা এখন ডাক্তারকে খুব একটা বিচলিত করে না।

বাস্তবে এই মেডিকেল স্টুডেন্ট আর ডাক্তারী জীবনটা চিকিৎসার জন্য জ্ঞানার্জনের সাথেসাথে কিছু খারাপ ধরনের মানসিক ক্ষমতা অর্জনের শিক্ষা। সোসিওপ্যাথিক অনেকগুলো গুন অর্জন না করলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যায় এই জীবনে।



একজন সোসিওপ্যাথের (Sociopath) আদর্শ বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করুনঃ
১) লজ্জাহীনতা ২) মিথ্যে বলার বিশেষ ক্ষমতা ৩) প্রতিকূল পরিবেশেও শান্ত থাকার প্রবনতা ৪) প্রথম দৃষ্টিতে মানুষের কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হবার ক্ষমতা ৫) সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিমান হবার বৈশিষ্ট্য ৬) মানুষকে মেনিপুলেট/ব্যবহার করার ক্ষমতা ৭) হটাৎ করেই প্রচণ্ড রাগ দেখানোর প্রবনতা ৮) হিউজ এগো বা গভীর আত্মসম্মানবোধ ৯) ক্রমাগত একদৃষ্টিতে কারো কথা শুনার ক্ষমতা ১০) মানুষের মুখ দেখে মনের ভাব বুঝতে পারার ক্ষমতা। ১১) বাইরে অনেক বন্ধুর মাঝে বাস্তবে খুব স্বল্পসংখ্যক সত্যিকারের বন্ধু ১২) যাদের বন্ধু মনে হয়, তাদেরকে সমাজের অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলার প্রবনতা।

নিজের সাথেই একবার মিলিয়ে দেখুন কয়টা ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন ইতিমধ্যে।

প্রথমবর্ষের প্রথম কার্ড ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো যেদিন, সেইদিনের কথা মনে পড়ে। ক্লাসের মাঝেই রেজাল্ট খারাপ হয়েছে শুনে অনেকেরই চোখে বাঁধ ভাঙ্গা কান্না। অনেকে ক্লাস থেকেও বের হয়ে গেলো। আজকে প্রায় ৭/৮ বছর পরে সেই আমাদেরই এখন রোগীর মৃত্যু দেখলেও একটু দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কোন অনুভূতি মনের মাঝে আসবে না। আরও অসংখ্য উদাহরণ পাবেন একটু খুঁজলেই, যেখানে নিজেই বুঝতে পারেন নিজের অনুভূতির ঘাটতি থেকে গেছে। মানবতার সেবা আর জ্ঞানার্জনের নামে নিজের আদি ও অকৃত্রিম অনুভূতিগুলো কতোখানি হারিয়ে ফেলেছেন একবার ভেবে দেখেছেন কি? নাকি হেসেই উড়িয়ে দিবেন এটাকে বড় হবার কুফল ভেবে?

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস

গতবছরের জুলাইয়ের দিকের কথা। ইন্টার্নশিপের অংশ হিসাবে কেজুয়ালিটিতে ডিউটি চলছে তখন। একদিন সন্ধ্যাবেলা ডিউটিরুমে বসে আছি আমি, সাথে আরেকজন সিনিয়র ভাইয়া। পেসেন্টের চাপ না থাকায় বসে বসে টিভি দেখছি। এমন সময় ওয়ার্ডবয় এসে খবর দিলো দুইটা বাচ্চা রোগী এসেছে। কেজুয়ালিটিতে বড়দের চিকিৎসার থেকেও খারাপ হল বাচ্চাদের চিকিৎসা করা। এরা সম্ভব হলে চিৎকার করে কানের পর্দা ফাটায়। তারপরেও নিতান্ত বাধ্য হয়েই পা বাড়ালাম।



ইমারজেন্সি রুমের ভিতরে ঢুকে আমার চক্ষু চড়কগাছ। দুটো বাচ্চার গাল, পিঠ আর হাত পায়ে শুধু কামড়ের দাগ! বাচ্চাগুলো সম্ভবত শকের কারনে কান্না করতেও ভুলে গেছে। বাচ্চার সাথের লোকজনকে জিজ্ঞেস জানলাম, এরা চাঁদপুর থেকে এসেছে। ওইখানে একটা এলাকায় এক কুকুর পাগল হয়ে সবাইকে কামড়ে দিচ্ছিল। বাচ্চাদুটো খেলার মাঠে গিয়ে সেই কুকুরের সামনে পড়ে গেছে। ওয়ার্ডবয়কে সাথে ডিউটিতে থাকা সিনিয়র ভাইকে ডাকতে বলে থার্ড ইয়ারের কমিউনিটি মেডিসিনের পাতায় কোনকালে পড়া রেবিস/জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা মনে করার চেষ্টা চালালাম। এর আগে কখনো এরকম কেইস দেখা হয়নি আমার। দ্রুত যা মনে পড়ে তা দিয়েই রোগীর পার্টির কাছে কিছু জিনিসপত্র আনার লিস্ট ধরিয়ে দিলাম। ভাইয়া এসে সাথে রেবিস ভ্যাক্সিনের নামটা যোগ করলেন।

ওয়ার্ড বয়ের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক ভাবে নরমাল স্যালাইন এনে কামড়ের জায়গাগুলোতে ঢালা হল। এবার বাচ্চাগুলোর কান্না শুরু হল। মায়াদয়া না দেখিয়ে বেশ নির্মমভাবেই কামড়ের জায়গাগুলো জ্বালাময়ী সব সাবান, এন্টিসেপটিক সল্যুশন দিয়ে ওয়াশ করতে হল। এদের মুখের উপরে গালের চামড়াগুলো ক্ষতবিক্ষত। রোগীর মা বারবার বলতে লাগলেন, আমার মেয়ের গালটা অন্তত সেলাই করে ঠিক করে দেন। অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত বুঝানো হল রোগীর চিকিৎসার স্বার্থেই রোগীর কোন ক্ষততে তাৎক্ষণিক ভাবে সেলাই করে দেয়া যাবে না। তবুও মায়ের কান্না আর থামে না।
শেষমেশ ওয়াশ আর এন্টিরেবিস ভ্যাক্সিন দেয়া শেষ হবার পড়ে গ্লাভস খুলে মোবাইলটা বের করলাম। আর কোন কিছু বাদ পড়লো কিনা জানা দরকার। আরেক সিনিয়র ভাইয়াকে ফোন দিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলার পর গালে আর ঘাড়ে কামড়ের কথা শুনে তিনি ক্যাটাগরি-৩ রেবিস এক্সপোজার হিসাবে পেসেন্টকে রেবিস ভেক্সিনের সাথেসাথে রেবিস ইউমিনোগ্লবিউলিন দেয়া প্রয়োজন বলে ধারনা করলেন। এরপর আরেক বিপত্তি, এটা নাকি কুমিল্লায় পাওয়া যায় না। এমনকি ঢাকার অনেক নামীদামী ফার্মেসীতেও পাওয়া যায়না। শেষমেশ তিনি খোঁজ নিয়ে জানালেন, খুব সীমিত পর্যায়ে মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে এটার সরবরাহ রয়েছে। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা আর এন্টিরেবিস ভ্যাক্সিন দেয়ার পড়ে রেবিস ইউমিনোগ্লবিউলিন দেয়ার জন্য বাচ্চা দুটোকে সেখানে রেফার করা হল।
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক রোগ দিবস। এই রোগ এমনই ভয়ঙ্কর যে একবার রোগের লক্ষন দেখা দিলে ধরে নিতে হয় মৃত্যু একশত ভাগ নিশ্চিত। এই পর্যন্ত পৃথিবীতে শুধুমাত্র ৭ জন ব্যাক্তি এই রোগ হবার পরে জীবিত ছিল, সেটাও সাথে সাথে ভ্যাক্সিন সহ আরও অন্যান্য চিকিৎসার জোরে। কিন্তু বাকিদের ভাগ্য এতো প্রসন্ন হয় না। এদের জন্য থাকে বেদনাদায়ক মৃত্যু। অথচ এই রোগ সঠিক চিকিৎসায় ১০০% ই প্রতিরোধযোগ্য।

জলাতঙ্ক বা রেবিস নিয়ে অনেক কথাবার্তা হলেও এটাকে নিয়ে জানার কিছুটা দিকে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। এর কিছুটা পূরণে রেবিস নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা তুলে ধরছি।

রেবিস/জলাতঙ্ক রোগ কি?

- এটি একটি ভাইরাস সৃষ্ট রোগ। রেবিস ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত কুকুর, শিয়াল, নেকড়ে, বাদুড় এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ঘোড়া এবং গরুর দেহ থেকে এটি মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে ৯৬% ক্ষেত্রে কুকুর থেকেই (কুকুরের কামড় অথবা লালা থেকে) এই রোগ মানবদেহে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি আক্রান্ত স্থানের নার্ভটিস্যুতে প্রবেশ করে এবং প্রতিদিন ১২-২৪মিমি করে ব্রেইন এবং স্পাইনাল কর্ডের দিকে এগুতে থাকে। রেবিস ভাইরাস একবার ব্রেন টিস্যুতে প্রবেশ করলে মৃত্যু নিশ্চিত। কামড়/আক্রান্ত হওয়া থেকে রোগের লক্ষন প্রকাশ পাওয়ার সময়কাল কয়েকদিন থেকে শুরু করে এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু লক্ষন প্রকাশের ১ থেকে ৭ দিনের মাঝে রোগী যতই চিকিৎসা করা হোক না কেন, শেষমেশ মারাই যায়। তাই সংক্রামক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পরপরই লক্ষন প্রকাশের আগেভাগেই উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়াই এই রোগের হাত থেকে বাঁচার উপায়।

রোগে আক্রান্ত কুকুরের লক্ষন কি?

- ১) কোন কারন ছাড়াই কামড় দেয়ার প্রবনতা। ২) কারন ছাড়াই ছুটাছুটি এবং গর্জনের প্রবণতা। ৩) মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালাক্ষরণ হতে থাকা।

আক্রান্ত রোগীর লক্ষন কি?

- ১) আক্রান্ত জায়গায় প্রাথমিক ভাবে ব্যাথা এবং চিনচিনে অনুভূতি। ২) পানির প্রতি ভীতি (যে কারনে রোগের নাম জলাতঙ্ক)। ৩) অস্থিরতা, অতিরিক্ত লালাক্ষরণ, খিঁচুনি এবং সবশেষে মৃত্যু।
কোন কুকুরের কামড় খেলে প্রাথমিক ভাবে কি করবেন?

- টেপের পানি/নরমাল স্যালাইন হাতের কাছে যাই পান তা দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা। সাথে সাবান ব্যবহার করে যতটুকু সম্ভব ফেনা তুলে ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার করা। এরপর পভিডন আয়োডিন অথবা ডেটল অথবা সেভ্লন সল্যুশন ব্যবহার করে ক্ষতস্থান আবারো পরিষ্কার করা। সবকিছুর প্রথমে নিজের সেফটির জন্য গ্লাভস পরে নিবেন অবশ্যই। যত দ্রুত সম্ভব, ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

লেখার এই অংশটা মেডিক্যাল স্টুডেন্ট / আমার মতো অজ্ঞ ডাক্তারদের জন্যঃ

## কি মেসেজঃ

- ওয়াশ, ওয়াশ এন্ড ওয়াশ। ক্ষতস্থানে কোন সেলাই দিবেন না। একটু দেরী করে সেকেন্ডারি ক্লোজার করাই ভালো। শুধু অতিরিক্ত রক্তপাত হলে সেটি বন্ধের ব্যবস্থা নিবেন।

- ভ্যাক্সিন শিডিউলঃ ১) ইসেন শিডিউল অনুসারে ৫ দিন ৫ ডোজ। ডে-০, ডে-৩, ডে-৭, ডে-১৪ এবং ডে-২৮ এ ইন্ট্রামাস্কুলার ইঞ্জেক্সন। ২) জেগরেব শিডিউল অনুসারে ৩ দিনে ৪ ডোজ। ডে-০ তে দুই হাতে দুটো ডোজ তারপর ডে-৭ আর ডে-২১ এ আরেকটা ডোজ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জেগরেব শিডিউলকে আদর্শ ধরা হয়ছে। এই ভ্যাক্সিনগুলো সদর হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। আবার দোকানেও কিনতে মিলে। প্রেগন্যান্ট মহিলাকেও এটি দেয়া যাবে।

- ইমিউনোগ্লবিউলিনঃ ক্যাটাগরি-৩ ইঞ্জুরির (মাল্টিপল বাইট, হাতের আঙুল, মুখ, গলা যেসব অংশে নার্ভ সাপ্লাই বেশী সেই সব জায়গায় কামড়) ক্ষেত্রে ভেক্সিনের সাথে ইমিউনোগ্লবুলিন দেয়া উচিৎ। প্রথম ডোজের ভ্যাক্সিন দেয়ার সাতদিনের মাঝেই এটা দিতে হবে। এটি ক্ষতস্থানে (২০IU/Kg maximum 1500IU) ইনফিল্ট্রেট করে দেয়া হয় মূলত, আবার ডেলটয়েড মাসলের দেয়া যাবে। তবে ভ্যাক্সিন যে জায়গায় দিয়েছেন সেই জায়গায় না এবং ভ্যাক্সিন আর ইমিউনোগ্লবিউলিন দেয়ার জন্য পৃথক পৃথক সিরিঞ্জ ব্যাবহার করতে হবে। ইমিউনোগ্লবিউলিন বায়োলজিকাল প্রডাক্ট বলে রিএকশন করতে পারে, তাই সেটার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত (এড্রেনালিন, হাইড্রোকরটিসন, ফেনারগন, রেনিটিডীন ইনজেকশন) রাখতে হবে।

দেশে সংক্রামক রোগের ন্যাশনাল গাইডলাইনে জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসার সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। একইসাথে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের আরেকটি গাইডলাইন আছে। দুটোর পিডিএফ ফাইল হিসাবে নিচে ডাউনলোডের জন্য দিয়ে দিলাম।

জলাতঙ্ক নিয়ে জাতীয় গাইডলাইন (২০১০) – http://goo.gl/75OxqE
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন গাইডলাইন - http://goo.gl/OZiQZK

Update: Incepta has also brought Rabix-IG, which should be available countrywide. 

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মেডিক্যালীয় রহস্যঃ সিন্ড্রোম এক্স

ছোটবেলায় প্রতি শুক্রবারেই দেখতাম মামাতো ভাইদের গভীর আগ্রহে বিটিভিতে “The X-files” সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে। টিভি সিরিয়ালটা শুরু হতো বিটিভির রাতের খবরের পরে। অনেক আগ্রহ নিয়ে আমিও সারাদিন অপেক্ষা করে রাতের খবর দেখতে দেখতে কখন যে সিরিয়াল শুরু হবার আগেই ঘুমিয়ে পরতাম, বলতেও পারতাম না। পরদিন সকালে উঠে আফসোসের সীমা থাকতো না। মাঝেমাঝে দুই-একদিন বিরক্তির সীমা কাটিয়ে রাতের খবর পার করে সিরিয়ালের সময় পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে “The X-files” এর সূচনায় মিউজিকটা শুনেই একরকম শিহরণ জাগতো। প্রতি পর্বে রোমহর্ষক এক একটা রহস্য, সমাধানের বাইরে! “X” শব্দটাই যেন রহস্যময়।

The X-files এর হয়তো অনেকটাই কাল্পনিক। কিন্তু চিরকাল এই “X” শব্দটা মানুষকে রহস্যের স্বাদ দিয়ে গেছে। আমার চিরাচরিত মেডিকেল প্রসঙ্গ নিয়ে আসি, মেডিকেলের এমনই একটা অমীমাংসিত কেইসকে এখনো বলা হয় “Syndrome X”।

১৯৯৩ সালের ৮ই জানুয়ারিতে আমেরিকার বাল্টিমোরের মেরিল্যান্ডের জন্ম নেয় এক মেয়ে শিশু, নাম দেয়া হয় ব্রক গ্রীনবারগ (Brooke Greenberg)। জন্মের সময় পায়ের একটা হাড় কোমরের একটা জয়েণ্ট থেকে একটু আলাদা থাকা (হিপ ডিসলোকেশন) এই ছাড়া আর কোন সমস্যাই ছিল না তার। এই সমস্যা অপারেশন করে ঠিক করে দেয়া হয়, ব্রুককে স্বাভাবিক সুস্থ বাচ্চার মতোই দেখায় তখন।

এরপর ৬ বছর বয়সের মধ্যে তাকে একের পর এক মেডিকেলীয় সমস্যার মধ্য দিয়ে পার করতে হয়, একবার স্টোমাকে পারফরেসন (পাকস্থলীতে ফুটো হয়ে যাওয়া), একবার খিঁচুনি, একবার ব্রেন স্ট্রোক। এমনকি একবার ব্রেন টিউমার ডায়গ্নসিস হওয়ার পর কয়েকদিন পর টিউমারটি গায়েব হয়ে যায়।
একসময় হটাৎ করেই ব্রকের বাবা লক্ষ্য করেন যে মেয়ের বয়সের সাথে আর শরীরটা বাড়ছে না। ব্রকের ছোটবোন শারীরিক ভাবে বড় হয়ে ব্রককেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে! তার ধারণার সাথে ডাক্তাররাও প্রমাণ খুঁজে পান যে ব্রকের বয়স বাড়া হটাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রকের ক্রমোজম পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ক্রমোজমের সাথে তার ক্রমোজমের কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না তখন। এমনকি ক্রমোজমের যেসব অংশ বয়স নিয়ন্ত্রণ করে এবং বয়স সংক্রান্ত রোগ ঘটায় (যেমনঃ প্রজেরিয়া) এরকম এবনরমাল ডিএনএ বা কোনকিছুই পাওয়া যায়নি তার পুরো ডিএনএ সিকুন্যন্সিং করানোর পরেও।



ব্রকের সাথে জন্ম নেয়া ছেলে মেয়েরা স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে ঢুকে পড়ে, কিন্তু ব্রকের চেহারা, মানসিকতা এবং আচার আচরণ থেকে যায় ছোট বাচ্চার মতো। ১৬ বছর পার করা ব্রকের ব্রেইন পরীক্ষা করে দেখা যায় সেটা ছোট বাচ্চার ব্রেনের থেকে বেশী কিছুতে ডেভলাপ করেনি। তার মন ছিল ৮ থেকে ১২ মাস বয়সী বাচ্চার মতো। ব্রক বড় হতে থাকে তার ছোটবোনের কোলে। ব্রক ছোটবাচ্চাদের মতোই কথা বলতে পারতো না, শুধু মুখ দিয়ে কিছু শব্দ করতে পারতো। হাড় বা দাঁতগুলোও ছিল অপরিপক্ক। শুধু বাড়তো তার চুল আর নখটুকু। দেহের বিভিন্ন অংশের একেক রকম বাড়তে দেখে বিজ্ঞানীরা এখনো ধারনা করেন ব্রকের শরীরের একেকটা সেল ছিল একেক বয়সের। যেন একেকটা আলাদা আলাদা গাড়িতে করে চলা। একে ব্যাখ্যা করার মতো আজো উপযুক্ত কোন কারন খুঁজে পাননি তাঁরা। ব্রককে নিয়ে প্রচুর গবেষণা এবং ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়, ইচ্ছে হলে গুগুলে Brooke Greenberg লিখে একটু খুজলেই দেখতে পাবেন।

১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সাল, ২০টি বছর ছোট্ট বাচ্চা থাকার পরে যে হাসপাতালে ব্রক জন্ম নিয়েছিল ঠিক সেই হাসপাতালেই মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর কারনটা পারিবারিক ভাবে গোপন রাখা হয়। শুধু ব্রক না, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম আরও কিছু বাচ্চার প্রায় একই রকম কেস খুঁজে পাওয়া যায়। সবগুলোই এখন চলমান গবেষণার কেস। এখনো পর্যন্ত অমীমাংসিত এই রোগ (??) অথবা রহস্যের নাম দেয়া হয় “সিন্ড্রোম-এক্স”। এগুলোই বাস্তব জীবনের সত্যিকারের এক্স ফাইল।।

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ডায়বেটিস এবং কিছু প্রচলিত প্রশ্ন

প্রথমবর্ষের ফিজিওলজি থেকে শুরু করে মেডিকেল লাইফে যতদিন থাকা, ততদিনই সম্ভবত ঘুরে ফিরে বারবার “ডায়বেটিস” শব্দটির মুখোমুখি হওয়া। কখনো পরীক্ষার হলে, কখনো পরিবারের লোকজনের কাছে কখনো রোগীর কাছে। এমনকি মেডিকেল স্টুডেন্ট/ডাক্তার না হলেও প্রতিনিয়ত পরিবার আর সমাজের এই শব্দের মুখোমুখি হওয়া। এতোকিছুর পরেও এই পরিচিত মুখটিকে নিয়ে কিছু অজ্ঞতা থেকেই যায়।





গত দুই মাসের ডায়বেটিক হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে নিজের অজ্ঞতাগুলো নতুন করে আবিষ্কার করলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু জিনিস শেয়ার করা।

>> আমার রোগীর কয়েকদিন আগে প্রথমবার ডায়বেটিস ধরা পড়লো। রোগী কি কখনো ভালো হবে??
>> অনেক বছর আগে ডায়বেটিস ধরা পড়ছিলো ডাক্তারসাহেব, এরপর ভালো হয়ে গেছি।
>> রিপোর্টে তো ডায়বেটিস নাই ডাক্তারসাহেব, তারপরেও ডায়বেটিসের ঔষধ দিলো কেন?
>> ইনসুলিনের বদলে মুখে খাবার ঔষধ দেন তো স্যার, ইনসুলিন নিতে ভালো লাগে না।
>> ডাক্তারসাহেব, আমার ওজনতো এতো বেশী না। তাহলে ডায়বেটিস কিভাবে হল?

এরকম বেশ কিছু প্রশ্ন প্রতিনিয়ত রোগী এবং রোগীর লোকজনের মুখ থেকে শুনতে পাই। অন্য কোন রোগের ব্যাপারে মানুষ এতো প্রশ্ন জানতে চায় না, যতটা না এই রোগ নিয়ে জানতে চায়। ডায়বেটিস নিয়ে বিপুল জনসচেতনতাই এতো প্রশ্ন সৃষ্টির কারন।

>> রোগী কি ভালো হবে? / অনেক বছর আগে ডায়বেটিস ধরা পড়ছিলো ডাক্তারসাহেব, এরপর ভালো হয়ে গিয়েছিলাম?

> ডায়বেটিসকে এখনো পর্যন্ত বলা হয় অনিরাময়যোগ্য রোগ। টাইপ-১ ডায়বেটিস, যেটা কিনা পেনক্রিয়াসের সেল ড্যামেজ থেকে হয়ে থাকে, সেটি পেনক্রিয়াস ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট অপারেশন করে তাক্তিকভাবে নিরাময়যোগ্য। কিন্তু বেশ খারাপ ধরনের রিস্ক থাকার কারনে পেনক্রিয়াস ট্র্যান্সপ্ল্যান্টের ইন্ডিকেসনটা এখনো পর্যন্ত খুবই সীমিত এবং বাংলাদেশের মতো দেশে সুযোগটা আরও সীমিত।

> টাইপ-২ ডায়বেটিস যেটা কিনা পেনক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন কমে যাওয়ার সাথে সাথে শরীরের ইনসুলিনের ব্যবহারের প্রতি রেজিস্টেন্স জন্ম নেয়, সেটি এখন পর্যন্ত অনিরাময়যোগ্য। খুব অল্প রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে একবার টাইপ-২ ডায়বেটিস হওয়ার পরে রোগটা অনেকটা রিমিসনে যেতে পারে। এখানে রিমিসন মানে কি? এটাকে ব্যাখ্যা করা যায় এইভাবে, রোগের সাইন সিম্পটম নাই, ব্লাড গ্লুকোজ পরীক্ষার রেজাল্টও স্বাভাবিক, মেডিসিন বা লাইফস্টাইল মডিফিকেসন যেমন ব্যায়াম বা ওজন কমানো ছাড়াই ব্লাড সুগার নরমাল থাকা। কিন্তু এরকম ঘটনা অতীব বিরল এবং এখনো প্রশ্নের সম্মুখীন। বেশীরভাগক্ষেত্রে যা হয়, সেটা হল রোগীর ডায়বেটিসের লক্ষন এবং ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রনে থাকে হয় মেডিসিনের জন্য, না হয় লাইফস্টাইল মডিফিকেসন যেমন খাওয়াদাওয়া নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম বা ওজন কমানোর জন্য। এতে রোগীর একটা ধারনা হতে পারে রোগী ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে সেটা কখনোই হয় না। এক্ষেত্রে রোগী যদি আবার অনিয়ন্ত্রিত জীবনে আবার ফিরে যায়, তবে আবার ডায়বেটিসের লক্ষণগুলো ফিরে আসে, রোগীর মনে একটা ধারনা হয়, রোগী একবার ভালো হয়ে গিয়ে আবার নতুন করে ডায়বেটিস হয়েছে।

>> রিপোর্টেতো ডায়বেটিস নাই ডাক্তারসাহেব, তারপরেও ডায়বেটিসের ঔষধ দিলো কেন?

> রোগীর লক্ষন (ঘনঘন পানির পিপাশা পাওয়া, বারবার প্রস্রাব হওয়া, ওজন কমে যাওয়া সহ আরও বেশকিছু) দেখে ডায়বেটিস মনে হলে প্রথম পরীক্ষাটাই হবে OGTT (ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট)। এটা ডায়বেটিস রোগীর জীবনে একবারই হবে এবং সে ডায়বেটিক কিনা সেটা এই পরীক্ষা থেকে জানা যাবে। এরপর থেকে রোগীর চেক-আপে আসলে যে পরীক্ষা করা হবে সেটা হল, Fasting & 2 hours after Breakfast ব্লাড সুগার লেভেল। এই পরীক্ষার রিপোর্ট নরমাল আসতেই পারে! কারন পেসেন্ট একবার ডায়বেটিক বলে ধরা পড়ার পরে সে খাবারদাবার নিয়ন্ত্রণ, মেডিকেসন আর ব্যায়াম সহ জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখলে পরীক্ষায় ব্লাড সুগার নন-ডায়বেটিক লেভেলে থাকবেই। দুঃখের বিষয় হল অনেকে, এমনকি ডাক্তাররাও OGTT আর Fasting & 2 hours after Breakfast ব্লাড সুগার এই দুই পরীক্ষার পার্থক্য গুলিয়ে ফেলে। দুটোর ইন্ডিকেসন আর ইন্টারপ্রিটেসন পুরোই ভিন্ন। একবার ধরা পড়া ডায়বেটিক রোগীর Fasting & 2 hours after Breakfast ব্লাড সুগার দেখে যদি যদি তাকে নন-ডায়বেটিক ভাবেন তো শুধু ভুলই হবে।

> আরেকটা ব্যাপার হল অনেক রোগী Fasting & 2 hours after Breakfast ব্লাড সুগার করার আগে তার চলমান প্রেস্ক্রিপ্সনের মেডিকেসন ইনসুলিন/ওরাল ড্রাগ না নিয়েই রক্ত দিয়ে পরীক্ষা করে। এতে ভুল রিপোর্ট আসবে, কারন ঐদিন তার রক্তে সুগার বেশী থাকবে। এতে বর্তমানে চলমান মেডিসিনগুলো কতোটুকু কার্যকর সেটা বুঝতে বিশাল সমস্যা হবে। এমনকি ডাক্তার ভুল করে ডোজ বাড়িয়ে দিয়ে রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়া করিয়ে দিতে পারেন। তাই রোগীর ফলো-আপের আগেই জিজ্ঞেস করে নিন আজকের দিনের মেডিসিন সে খেয়ে এসেছে কি না।

>> রিপোর্টে তো ডায়বেটিস নাই ডাক্তারসাহেব, তারপরেও ডায়বেটিসের ঔষধ দিলো কেন?

> এই ব্যাপারটা অনেকটা বিতর্কিত। মেটফরমিন নামের ডায়বেটিক ড্রাগ অনেকসময় নন-ডায়বেটিক দের প্রেসক্রাইব করা হয়। এর পিছনে কিছু যুক্তি থাকে, যেমন পেসেন্ট মোটাসোটা অথবা OGTT করে পাওয়া প্রি-ডায়বেটিক স্টেটে (Impaired Fasting Glucose or Impaired Glucose Tolerance) থাকা রোগীদের লাইফস্টাইল মডিফিকেসনের সাথেসাথে অনেক সময় মেটফরমিন প্রেস্ক্রাইব করা হয় যাতে ভবিষ্যতে ডায়বেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমে যায় বা ডিলে করা যায়। মেটফরমিনের সাথে অন্যান্য ডায়বেটিক মেডিকেসনের পার্থক্য হল যে এটা দেহের সেলে ইনসুলিনের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ায় সেলের ইনসুলিন রিসেপ্টরের দুর্বলতা কমিয়ে দিয়ে। কিন্তু নরমাল এন্টিডায়বেটিক মেডিকেসনের মতো ব্লাডসুগার কমায় না। তাই চিকিৎসাপত্রে মেটফরমিন থাকা মানেই ডায়বেটিস আছে কি না, অথবা নিজে দিলে কেন দিলেন সেটা রোগীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়া উচিৎ।

>> ইনসুলিনের বদলে মুখে খাবার ঔষধ দেন তো স্যার, ইনসুলিন নিতে ভালো লাগে না।

> সব রোগীর নিয়মিত কমপ্লেন বা ডিমান্ড হল সিরিঞ্জের বদলে মুখে খাবার মেডিসিন দেয়া। আপাতদৃষ্টিতে মুখে খাবার ড্রাগগুলো কিছুই করে না, “একটা রসকস বিহীন লেবুর মতো মৃতপ্রায় পেনক্রিয়াস কে চাবুক চালিয়ে কিছু ইনসুলিন বের করার চেষ্টা চালায়।” একসময় পেনক্রিয়াস ক্লান্ত ঘোড়ার মতোই প্রান হারায়। তখন শেষ পর্যন্ত মুখে খাবার ড্রাগ থেকে ঠিকই ইনসুলিনেই কনভার্ট করতে হয়। তাই ডায়বেটিস যে লেভেলই থাক না কেন, সবথেকে ভালো ড্রাগ হল ইনসুলিন। রোগীকে কনভিন্স করাটাই শুধু ডাক্তারের ক্রেডিট। তাছাড়া দেহের ইনসুলিনের সাথে বাজারের ইনসুলিনগুলোর মিল থাকার কারনে সাইড এফেক্ট মুখে খাবার ড্রাগ গুলো থেকে অনেক কম এবং ৫/১০ বছর পরে ডায়বেটিসের কমপ্লিকেসন হবার ঝুকিও কমে যায় অনেকখানি ইনসুলিনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে।

>> ডাক্তারসাহেব, আমার ওজনতো এতো বেশী না। তাহলে ডায়বেটিস কিভাবে হল?

> ওজন বেশী থাকাটা ডায়বেটিসের একটা রিস্ক ফ্যাক্টর। একমাত্র রিস্কফ্যাক্টর না। এরপরেও বুঝানোর পরেও অনেকে মানতে চায় না যে শরীরের অবসিটি না থাকলেও ডায়বেটিক হওয়া সম্ভব।
এরকম প্রতিদিন অসংখ্য প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে প্রতিদিনই নিজেরই নতুন অনেককিছু শেখা হয়ে যায়। ফাস্ট প্রফে সিলেবাসে গাইটনের ডায়বেটিস আর দ্বিতীয় প্রফে ফার্মাকোলজির এন্টি-ডায়বেটিক মেডিকেসন চ্যাপ্টার পড়ে মনেই হতো, এটাতো কতোই সোজা। এখন দিনদিন অজ্ঞতার পরিমান আবিষ্কার করে শুধুই মনে হচ্ছে, দিনকে দিন শুধু মূর্খই হচ্ছি। অনেক লম্বা আর বোরিং লেকচার হয়ে গেলো। প্রত্যেক পরিবারেই কারো না কারো এই রোগের সাথে পরিচিত হয়ে গেছে। সেই কথা চিন্তা করেই লিখা। কারো কৌতূহল কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারলে খুশী হবো।।

২০ আগস্ট, ২০১৪

হাসপাতাল যখন বৃদ্ধাশ্রম

মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন থাকা অবস্থায় প্রায়ই কিছু রোগীকে দেখতে পেতাম যারা হাসপাতালকে ছাড়তে চাইতো না। এরা অনেক প্রকারের হতো। কেউ পারিবারিক অশান্তির শিকার, কেউ মানসিক ভাবে অবহেলিত। অল্প বয়সী কিছু মেয়েকে দেখা যেত যারা স্বামী শাশুড়ির সাথে ঝগড়া করে ভর্তি হতো একগাদা মনগড়া সমস্যা নিয়ে। সব পরীক্ষানিরীক্ষার পর রিপোর্ট নরমাল হওয়ার পরেও তাদের বিশ্বাস হতো না যে তারা সুস্থ। কখনো নরম সুরে আবার কখনো কঠিন সুরে এদেরকে বিদেয় করতে হতো মাথায় চড়ে বসার আগেই।

আরেকদলে ছিল আদুরে স্বভাবের কিছু ছেলে মেয়ে, ভর্তি হতো কি সমস্যা নিয়ে সবাই ধারনা করতে পারবেন। সরকারী হাসপাতালে এদের সংখ্যা কম হলেও এদের সাথের অতি সচেতন অভিভাবকের সংখ্যা কখনো কম হতো না। হাসপাতালে এসেই এদের প্রথম দাবী হতো হাসপাতালের কেবিনে সিট নেয়া, বিদায় নেয়ার সময় শেষ কথা হতো অভিযোগ দিয়ে যে হাসপাতালের সেবার মান খুবই খারাপ। অভিভাবক রোগীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় করলেই আদুরে মেয়ে বা ছেলে আরও কয়েকদিন হাসপাতালে থেকে নিজের দামটা বাড়িয়ে নিতে চাইতো। 

শেষদলে থাকতো যারা, তাদেরকে বিদেয় করতেই খারাপ লাগতো সবচেয়ে। কোন বুড়ো বা বুড়ি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার সময় প্রায় সবসময়ই শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব হয় না। দিন যায়, রোগ কিছুদিন ভালো থাকে, কিছুদিন খারাপ। কিন্তু দিনের সাথে সাথে শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যা কমতে থাকে। একসময় রোগীর সঙ্গী হয় তার বয়োবৃদ্ধ স্বামী/স্ত্রী অথবা অবিবাহিত মেয়েটি। হাসপাতালকেই এরা আপন করে নেয়, আসেপাশের রোগীর সাথে তাদের গড়ে উঠে এক গভীর সম্পর্ক। পারিবারিক জীবনে এরা কতোখানি একাকীত্বে ভুগে সেটা ফুটে উঠে এদের হাতে ছুটির কাগজ ধরিয়ে দিতে গেলে বলতে দেখে, “আর দুইটা দিন থেকে গেলে ভালো হয় না বাবা?”




সরকারী হাসপাতালে সিট স্বল্পতা থাকায় এদেরকে অনেকটা জোর করেই বিদায় জানাতে হতো। বেসরকারীতে এই নিয়মের বাইরে পা ফেলতে হয় অনিচ্ছাসত্ত্বেও। “আমাগো পোলায় টাকা দিব, আপনাগো হাসপাতালে রইলে সমস্যা কিতা?” এই প্রশ্নের জবাবে চুপ হয়ে যেতে হয় অনেক সময়। পোলায় কেন টাকা দিয়ে রাখতে চায় হাসপাতালে, সেটা ডাক্তারও বুঝে রোগী বা তার একান্ত সঙ্গীও বুঝে। তবুও বুঝেও এই না বুঝার ভান করে চলা। একজন বৃদ্ধ অসুস্থ রোগীকে বাসায় রেখে তার সেবায় যে কষ্ট, তার থেকে আধুনিক মানুষগুলো বোধহয় চায় রোগী হাসপাতালেই পড়ে থাকুক। বৃদ্ধের সঙ্গী তার জীবনসঙ্গী বৃদ্ধা, দুজনে মিলে হাসপাতালটাকেই নতুন ঘর করে নেয় তখন। এখানেই খাওয়া দাওয়া, এখানেই গল্পগুজব। নতুন কোন রোগী ভর্তি হলে বৃদ্ধা ছুটে যান তার সাথে পরিচিত হতে। নতুন মুখগুলোর সাথে একটু পরিচিত হওয়া, এটাই তার জীবনের একমাত্র আনন্দ।


ছুটির কাগজ লিখেতে লিখেতে বিলের পাতার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠি মাঝেমাঝে। দুই/তিন লাখ টাকা বিল! পরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, রোগী থেকে গেছেন ছয়মাস হাসপাতালে। ছয়মাসের রোগীর বাসার মানুষের শান্তির ঘুমের মূল্য মাত্র তিন লাখ, খুব একটা বেশী না। হাসপাতালগুলোই বুঝি এই যুগের মানুষের জন্য নতুন বৃদ্ধাশ্রম।

০৮ আগস্ট, ২০১৪

প্রেক্ষাপটঃ ইবোলা ভাইরাস এবং বাংলাদেশ

গল্পের নায়ক জোনাথন হারকার, পটভূমি ট্রান্সেলভেনিয়ার কারপেন্থিয়ান পর্বতমালা, গল্পের ভিলেন কাউন্ট ড্রাকুলা। কিছু শব্দেই ভেসে উঠে ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলার গল্পের কথা। একশোরও বেশী বছর আগের লেখা এই গল্প অনুদিত হয়েছে বহু ভাষায়, এর ছায়া অবলম্বনেই লিখা হয়েছে শখানেক নাটক, বানানো কয়েক ডজন টিভি সিরিয়াল আর মুভি। হাল সময়ের মেয়েদের প্রিয় “ভ্যাম্পায়ারস ডায়রিস” ড্রাকুলা কাহিনীকে রোমান্টিকনেসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ড্রাকুলা কাহিনীর বিবর্তন কোথায় গিয়ে থামবে বলা কঠিন। ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ার শব্দগুলো শুনলেই ভেসে উঠে কোন রক্তচোষা জীবের নাম, যে মানুষের রক্তপানে জীবনধারণ করে অভিশপ্ত জীবনের বীজবহন করে নিরীহ মানুষের মাঝে সেটা ছড়িয়ে বেড়ায়।


কোন গল্পের পুরোটা কখনো মিথ্যে হয় না। ভ্যাম্পায়ার বেট/বাদুড় সত্যিকারের কোন জীব একথা প্রথম জানতে পারি ন্যাশনাল জিওগ্রাম্ফির পর্দায়। ছোট ছোট বাদুড় যারা বেচেই থাকে অন্য প্রাণীদের রক্তপান করে, মানুষও তাদের খাবারের তালিকা থেকে বাদ যায়না। অস্ট্রেলিয়া সহ আরও বেশ কিছু দেশে অসতর্ক সমুদ্রপ্রেমিক ক্যাম্পারদের প্রায়ই শিকার হতে হয় এসব বাদুড়ের, অনেকটা আমাদের দেশের মশার মতো। অনেকক্ষেত্রেই বাদুড়ের কামড়ের এসব ভিকটিমদের বড় কোন ক্ষতি হয়ে উঠে না। আবার অনেকসময় ড্রাকুলা কাহিনীর মতোই এরা ছড়িয়ে দিয়ে যায় কিছু অভিশপ্ত বীজ। নিপাহ, ইবোলা, সারস এরা বাদুড়ের কিছু অভিশপ্ত বীজের নাম।
খুব বেশী দিন আগের কথা না, ২০১১ সাল দেশের উত্তরবঙ্গের কথা। শীতের সকালে খেজুরের রস খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লো বেশ কিছু লোক। দ্রুত তাদের স্থানান্তরিত করা হয় নিকটস্থ হাসপাতালে। রোগ ধরার আগেই জ্বর, গায়ে ব্যথা আর ব্রেন ইনফেকশনের লক্ষন নিয়ে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়। শেষমেষ সংক্রামক রোগের বিশেষ বিভাগের সহায়তায় রোগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় নিপাহ ভাইরাস ইনফেকশন। নিপাহ ভাইরাস এদেশে এর আগে কখনই পাওয়া যায়নি, তবে কিভাবে হটাৎ করে বাংলাদেশে এই রোগ? কারন খুজতে গিয়ে এই থিওরিই খুঁজে পাওয়া হয় যে দেশের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা বাদুড় যারা ফলের রস খেয়ে বেচে থাকে তারা বয়ে নিয়ে এসেছিলো এই রোগ। খেজুর গাছের রস খাবার সময় তাদের থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে খেজুরের রসে এবং শেষমেশ স্থান হয় গাছগুলো থেকে খেজুরের রস খাওয়া মানুষগুলোর শরীরে। এরপর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে। (সূত্রঃ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ)
বর্তমানের উত্তর আফ্রিকার আরেক আতঙ্কের নাম ইবোলা ভাইরাস। এরও বহনকারী জীবগুলোর মাঝে অন্যতম একপ্রজাতির ফলখেকো বাদুড়। নানান ভাবে এই ভাইরাস স্থানান্তরিত হয় বাদুড় সহ আরও কিছু প্রাণীর দেহ থেকে মানবদেহে। সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মতো শুরু হয়ে শেষ পর্যায়ে রক্তের প্লেটলেটের পরিমান কমিয়ে দেহের নানান স্থান থেকে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তপাতের মাধ্যমে এটি আসলেই মানুষকে রূপ দেয় ড্রাকুলাগল্পের ভিক্টিমগুলোর মতো রক্তক্ষয়ী রুপে। একবার খারাপ পর্যায়ে চলে গেলে এতে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি। এটুকুই আশার ব্যাপার হল এই রোগ হাঁচিকাশি বা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না, শুধুমাত্র দেহের কোন সিক্রেসন যেমন থুথু, ঘাম বা চোখের পানি, বমি অথবা রক্ত এগুলোর স্পর্শে এই রোগ এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের দেহে ছড়ায়। আফ্রিকার যেসব দেশে (সিয়েয়া লিয়ন, জাম্বিয়া) এসব রোগ প্রতিনিয়ত হচ্ছে, দেশগুলোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নিযুক্ত আছে সেনাবাহিনীর অনেক বাঙ্গালী ভাইয়েরা। এখন আসলেই মনে প্রশ্ন জাগবে আমাদের দেশের মানুষ বা কতোটুকু নিরাপদ।
খুব সম্প্রতি সিয়েরা লিয়নের অন্যতম ডাক্তার ডাঃ শেখ উমর খান যিনি দেশের ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছিলেন, তিনি নিজেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁকে তার এই অবদানের কথা স্মরণ রেখে জাতীয় বীরের উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। যেকোনো সংক্রামক রোগের ঝুকির মাঝে সবচেয়ে বেশীই থাকেন একজন ডাক্তার, একজন মেডিকেল ছাত্র, একজন নার্স। কতো রোগীকে আমরা কিছু না জেনেই, উপযুক্ত প্রস্তুতি না নিয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। সচেতনতার কোন বিকল্প তাই তাদের জন্য হয় না।

মাঝেমাঝে নিজের কাছেই অবাক লাগে, এতো বিচিত্র রোগের মাঝে আমরা আসলে বেঁচে আছি কিভাবে? তখন উত্তর খুঁজে পাই ড্রাকুলা গল্পেরই এক প্রার্থনার মাঝে, “আমাদের এবং সকল অশুভ শক্তির মাঝে ঈশ্বর সর্বদা বিরাজমান”।।

০৪ আগস্ট, ২০১৪

হারানো বন্ধুর থিয়োরি - কিছু অনুচ্চারিত বন্ধুর স্মরণে

The lost friend’s theory (হারানো বন্ধুর থিয়োরি) এর আরেক নাম হাইজিন হাইপোথিসিস। ছোটবেলা থেকে হাঁচির এলারজির প্রবল সমস্যা থাকায় এলারজির পিছনে কি কি ফ্যাক্টর দায়ী সেটা জানা নিয়ে উৎসুক ছিলাম বরাবরই। হাইজিন হাইপোথিসিস শব্দটা প্রথম জানতে পারি মেডিকেল ড্রামা “হাউস এমডি” দেখতে গিয়ে। শুনতে অনেক কঠিন শুনালেও মানেটা অনেক সোজা। একজন মানুষ বাচ্চাকালে যতবেশী পরিষ্কার থাকবে, তার রোগ হবার সম্ভাবনা ততবেশী। কথাটা শুনতে উলটো শুনায়? কতখানি ঠিক এই তথ্য? 


হারানো বন্ধুর থিয়োরিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জীবাণুগুলো আমাদের হারানো বন্ধু। বিবর্তনের একেবারে শুরু থেকে মানুষ যখন বদলাতে শুরু করলো তখন সে একা বিবর্তিত হতে পারেনি, তার বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে রোগের জীবাণুগুলো। মানবদেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা এই জীবাণুদের দান। এক সদ্যোজাত শিশু যখন বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে আসে তখন তার দেহে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা প্রায় থাকেনা বললেই চলে। স্রষ্টার অশেষ কৃপাতে প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ তাকে পরোক্ষ ভাবে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু এই ছয় মাস জীবনের আরেক বন্ধু হল এই জীবাণুগুলো। জীবাণুগুলো দুর্বল ভেবে বাচ্চাকে আক্রমন করে পরে অবাক হয়ে যায় তার পরোক্ষ ভাবে পাওয়া এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেখে। যুদ্ধে হেরে পরাজয়ের পর পলায়নের সময় সে বাচ্চার নিজের দেহের প্রহরী রোগী প্রতিরোধের ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো কোষগুলোতে রেখে যায় নিজের ছাপ। ঠিক ছয়মাস পর মায়ের বুকের দুধের এই রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতাটা চলে যায়। তারপরেও, বহুদিন পার হয়ে যাবার পরেও যখন রোগের জীবাণু আবার আক্রমন করে দেহকে, চেনা শত্রুকে দেহের শিক্ষিত প্রহরীরা চিনে নেয় এক মুহূর্তেই। এই কারনে ছোটবেলার এসব ছোটখাটো সর্দিজ্বরকে প্রয়োজনীয় ধরে নিয়ে এদেরকে মানুষের বন্ধু বলে ধরে নেয়া হয়। প্রায় একই কথা দাড়ায় ডাস্ট, পোলেন আরও নানা এলারজির জন্য। যারা খুব ছোটবেলাতে গ্রামের ধুলোবালি, পরাগরেনু, পশুপাখির সংস্পর্শে থেকে বড় হয়েছে তাদের বড় হয়ে এসব এলারজির সমস্যা প্রায় থাকেই না বলে দেখা গেছে।
কিন্তু যুগের বিবর্তনে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আমরা এখন দিনদিন এসব রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছি। বাচ্চাকে প্রতিদিন এন্টিসেপ্টিক সাবানে গোসল করানো থেকে শুরু করে ধুলোবালির ছিটেফোঁটাবিহীন ঘরে রাখা, একটু অসুস্থ হলেই এন্টিবায়টিক গুলে খাওয়ানো আর কৌটাজাত দুধ খাওয়ানোর কারনে ছোটবেলায় যেসব রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনায়শে পেয়ে যাওয়ার কথা সেগুলোতে এযুগের বাচ্চারা ঘাটতিতে থেকে বড় হচ্ছে। দেহের প্রহরীরা বড় বেলায় বেয়াড়া স্বভাবের হয়ে যায়, বাইরের রোগের জীবাণুকে এরা তখন চেনার আগ্রহটুকু বোধ করে না। উলটো ঝামেলা বাধায় নিজের দেহের নিরীহ কোষগুলোর সাথে। এই কারনে প্রতিনিয়ত নিজের দেহের বিপরীতে নিজের ইউমিন সিস্টেম দিয়ে হওয়া রোগগুলো বাড়ছে। SLE, Acute Lymphoblastic Leukemia, Arthritis, Type 1 DM, Myasthenia Gravis এসব বিধঘুটে নামের রোগ যা নিজের দেহের অশিক্ষিত প্রহরী কোষ দিয়েই হয়, এসব রোগর নাম এতো ঘনঘন শোনা যাচ্ছে। আমাদের দেশ তাও এসব রোগে অনেক পিছিয়ে। উন্নত দেশগুলো যেখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় বেশী এগিয়ে, সেখানে ক্যান্সারের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর অনেক কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো যদি হয়তো বাচ্চাটা ছোটবেলায় একটু অসুখে ভুগত। হাইজিন হায়পোথিসিস বা লস্ট ফ্রেন্ডস থিয়োরি একে এমন ভাবেই ব্যাখ্যা করে।
আজকে বন্ধু দিবসের সাথে সাথে পহেলা আগস্ট থেকে আগামী সাত আগস্ট পর্যন্ত চলছে World Breast Feeding Week। এই দুইয়ের সঠিক প্রয়োগে হয়তো আগামী প্রজন্মকে কিছু আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এক মনিষী বলেছিলেন, “পৃথিবীতে যদি কোন ধুলাবালি না থাকতো, তবে মানুষ হাজার বছর বাঁচত।” কিন্তু বাস্তবে ধুলাবালি আর রোগজীবাণুর বন্ধুত্বপূর্ণ অবদানটাকেও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

২৯ জুলাই, ২০১৪

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

প্রায় তিন দশক আগের কথা, ২৬ জুলাই ১৯৮২। ৩১ বছর বয়সী তরুন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটিতে একটি শুটিং স্পটে একশন দৃশ্যে অভিনয় করছেন মনমোহন দেশাই-এর বিখ্যাত “কুলি” ছবির জন্য। সে জামানায় একশন দৃশ্যের জন্য স্টান্টম্যানের ব্যবহার এতো বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেনি, অভিনেতারা নিজেরাই চালিয়ে যেতেন বিপদজনক এই কাজ। একটি একশন দৃশ্যে অভিনয়কালে সঠিক সময়ের আগেভাগেই জাম্প দিয়ে গুরুতর আহত হলেন তিনি। গুরুতর আহত নায়ককে ব্যাঙ্গালোরে প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত নিয়ে আসা হল মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হসপিটালে। ডাক্তার জানালেন পেটের ভিতরে প্রচুর অভ্যন্তরীণ রক্তপাত হয়ে রোগীর অবস্থা আশংকাজনক, দ্রুত কয়েক ব্যাগ রক্ত লাগবে। তড়িঘড়ি করেই রক্ত জোগাড় করা হল, রক্ত জোগাড় করে অপারেশন থিয়েটারে দ্রুত ইমারজেন্সি স্প্লিনেকটমি করা হল এই মহানায়কের। এরপর দিন গেলো, স্রষ্টার কৃপায় ধীরে ধীরে অল্পঅল্প করে সুস্থ হতে থাকলেন তিনি। এরপর বহুবছর কেটে গেলো। আগের ঘটনার পর থেকে নায়ক স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে প্রায়ই রুটিন চেক-আপ করতে যেতেন ডাক্তারের কাছে। ৮ বছর পর লিভারের কিছু এবনরমাল টেস্ট রেজাল্ট দেখে ডাক্তারের সন্দেহ হল। আরও বিস্তারিত পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়লো নায়কের লিভার সিরোসিস (বাংলায় বলতে গেলে, যকৃতের প্রায় চিরস্থায়ী একটা রোগ যার কারনে যকৃতের ক্ষমতা ক্রমাগত কমে গিয়ে পুষ্টি উপাদানগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং যা পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে)। নায়ক অবাক হলেন, লিভার সিরোসিস রোগ এলকোহলিকদের মাঝে বেশী। তিনি তাঁর জীবনে মদ্যপানের স্বভাবটাকে ঘৃণা করে কঠিনভাবে একে সর্বদা বর্জন করে গেছেন। তবে কেন তাঁর এই রোগ? পরে দেখা গেলো তাঁর লিভার সিরোসিস এর কারন ভাইরাল হেপাটাইটিস। কবে কি ভাবে এই ভাইরাসের শিকার হলেন তিনি? এরও উত্তর পাওয়া গেলো, সেই মেসিভ ব্লাড ট্রান্সফিউসনের হিস্ট্রি থেকে। তখনকার দিনে হেপাটাইটিসের জন্য রক্তদানের আগে এন্টিজেন টেস্টগুলো ছিল অপ্রতুল, আর এতো অল্পসময়ে এতো বিশাল পরিমানের রক্ত লেগেছিল নায়কের যে হয়তো কোন রক্তের ব্যাগ বাদ পড়ে যায় পর্যাপ্ত পরীক্ষা থেকে। এখনো নায়ককে লিভার সিরোসিসের জন্য প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিয়ে যেতে হচ্ছে...





পুরো ঘটনাটা গল্পের মতো, বাস্তবে হরহামেশা এই গল্প নতুন করে লিপিবদ্ধ হচ্ছে। হেপাটাইটিস এখন মেডিসিনের এক অন্যতম রোগ। কিছু হেপাটাইটিস খুবই সাধারণ। বাইরে হয়তো খেতে গিয়ে ওয়েটারের দেয়া অপরিষ্কার পানির গ্লাস থেকেই হয়তো আক্রান্ত হবেন আপনি। দুর্বল আর হলুদবর্ণ ধারণ করে একমাস ঘরের ভিতর শুয়ে বসে থেকে বাংলাদেশের প্রন্থা অনুযায়ী তেলমশলা কম দেয়া বিস্বাদের খাবার খেয়ে ঠিকই ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু বিপদজনক প্রজাতির হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো রক্তের আদানপ্রদান, শারীরিক সম্পর্ক অথবা ড্রাগ নিডেলের মাধ্যমে আপনার দেহকে আক্রান্ত করে হয়তো বুঝতেই দিবে না যে আপনি অসুস্থ। নীরবে বাসা বানিয়ে আপনার দেহকে শেষ করে ঠিক শেষ মুহূর্তে জানান দিবে এই যে আমি তোমার চিরসঙ্গী ছিলাম চুপিচুপি।

স্কুলে যাবার পর থেকেই বাইরের খাবারের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ মেটাতে লুকিয়েচুরিয়ে বাইরে খাওয়া, হয়তো সেই খাওয়া থেকে জন্ডিস। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল, পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তার সাহেব জানালেন এক মাসের বিশ্রাম নিতে, এটাই নাকি চিকিৎসা। তখন ক্লাস ৬/৭ এ পড়ি। একমাসের বিশ্রাম মানে একমাসের স্কুল ছুটি। আমাকে আর কে পায়! অনেক বড় রোগীর মতো মুখ ভার করে বিছানায় শুয়ে থাকি, আত্মীয়স্বজনরা এসে দেখে যান। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে বেশ কিছু গল্পের বইও জোগাড় করে ফেললাম, সময়টা ভালোই কাটল। শুধু যন্ত্রণার ছিল খাওয়াদাওয়াটা, মুখের স্বাদটাতো নাই বললেই চলে, তার উপর আমার জন্য রান্নাতে তেলমশলার চরম ঘাটতি। এরমাঝে কে জানি পরামর্শ দিলে আয়ুর্বেদিক কোন ঔষধে নাকি জন্ডিসটা তাড়াতাড়ি কমে যায়। এক বোতল সেই ঔষধটাও জোগাড় করা হল, ঔষধের রঙটা দেখে আমার চীৎকারে অতঃপর আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সেইখানেই সমাপ্তি। ইতিমধ্যে আমার এক মামাতো বোন আমাদের পরিবার থেকে প্রথম ডাক্তারনী হয়ে বের হয়েছে। সে মা বাবাকে বুদ্ধি দিল, কোত্থেকে কোন ভ্যাক্সিনেশন করালে নাকি এই রোগের আরও খারাপ জাতভাই থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আমিও প্রথম প্রথম অনেক আগ্রহ নিয়ে গেলাম ভ্যাক্সিনেশন করাতে, প্রথমবার সূইের খোঁচাতেই আগ্রহ মিটে গেলো। তারপরও ডাক্তারবোনের জোরাজোরিতে পুরো ডোসটা শেষ করতে বাধ্য হতে হয়। এখনো মেডিকেলে অনেককেই দেখি ডাক্তার হয়ে গেছে, কিন্তু হেপাটাইটিসের ভ্যাক্সিনেশনটা করা নেই। তখন মামাতো বোনের ডাক্তারির কথাটা মনে চলে আসে।

এখন সরকার ছোট বাচ্চাদের ভ্যাক্সিনেশনে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিনটাকে যোগ করে দিয়েছে বিনামূল্যে। কিন্তু আমার ফ্রেন্ডলিস্টের প্রায় সবাই নব্বইের দশকের অথবা তারও আগের, তখন এই ভ্যাক্সিন সরকারের বিনামূল্যে প্রদানকারী ভ্যাক্সিনগুলোর তালিকায় ছিল না। তাই এমন মানুষ হয়তো কম হবে না যাদের এখনো ভ্যাক্সিন নেয়া হয়নি। ভ্যাক্সিন নিতে হয়তো কিছু টাকা বের হয়ে যাবে পকেট থেকে, তারপরও সামান্য সতর্কতাই অনেক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিবে আপনাকে। হেপা-এ এবং হেপা-বি এই দুই ভাইরাসের প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন আছে, সব থেকে খারাপ হেপা-সির প্রতিরোধে এখনো কোন ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই নিকটআত্মীয়র বাইরে কারো থেকে রক্তগ্রহনে বিশেষ সতর্কতা নিন, ধর্মীয় অনুশাসনের কোন বিকল্প নেই। এমনকি সেলুনে চুল কাটতে অথবা সেভ করতে গেলে নতুন ব্লেড কেনার টাকা দরকার হলে নিজের পকেট থেকে দিয়ে হলেও পূর্বব্যবহৃত ব্লেড বদলাতে বাধ্য করুন। ডাক্তার যারা আছেন, তাঁদের কাছে মামার বাড়ির গল্প গাইবো না। হেপাটাইটিস অথবা এইচআইভিযুক্ত হাইলি ডেঞ্জারাস ইনফেক্সাস রোগীকে কিভাবে ডিল করতে হয় এটা না জেনে কেউ পাস করে না। যদি মিস হয়ে যায় অথবা ভুলে গিয়ে থাকেন তো আরেকবার স্মরণ করে নিবেন।

যারা সন্ধানী/মেডিসিন ক্লাব/রক্তদান কর্মসূচীর সাথে জড়িত, তাদের সবথেকে বড় ভূমিকা হতে পারে মানুষকে একটুখানি সচেতন করে তোলায়। একটা ব্যবহারকৃত নিডলের মাঝে এইডস এর জীবাণু এইচআইভি আর হেপাটাইটিস দুটো জীবাণু থাকলে সেই নিডেল দিয়ে যদি প্রিক খান তবে আপনার এইডস হওয়ার যতটা না চান্স থাকবে তার থেকে প্রায় ১০০গুন বেশী চান্স থাকবে হেপাটাইটিস দিয়ে আক্রান্ত হবার। নিজের গরজে একটু স্যারদের জিজ্ঞেশ করে হলেও জেনে নিন, হেপাটাইটিস বি এর সংক্রামণে কি করবেন, হেপাটাইটিস সি এর সংক্রামণে কি করবেন। নিজে জেনে নিলে হয়তো নিজের সাথে অন্যদের জানার ঘাটতিটাও পূরণ করে দিতে পারবেন।

এতোকিছু বলার কারন আজকে “বিশ্ব যকৃত প্রদাহ দিবস”। নাহ, “বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস” এই বাংলিশটাই ভালো শোনায়। ঈদের খাবার খেতে গিয়ে পরিষ্কার পরিছন্নতায় এবার তাই হয়তো একটু বেশিই খেয়াল রাখবেন। সবাইকে আবারো ঈদের শুভেচ্ছা রইলো।।

২৩ জুলাই, ২০১৪

ডাক্তার এবং কৃতজ্ঞতার কার্পণ্য

এক গরিব বালক স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়িতে বাড়িতে পণ্য বিক্রি করতো। একদিন সে খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঠিক করলো পরবর্তী বাড়িতে গিয়ে খাবার চাইবে। দরজার কড়া নাড়ার পর এক মেয়ে বেরিয়ে এল। সে হতভম্ব হয়ে খাবারের পরিবর্তে এক গ্লাস পানি চাইল। মেয়েটি ক্ষুধার্ত ছেলেটিকে দেখে পানির পরিবর্তে এক গ্লাস দুধ দিল। সে পরিপূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধপান করলো এবং বলল, আপনাকে কতো দাম দিতে হবে? মেয়েটি বলল, মা শিখিয়েছে ভালোবেসে কিছু দিলে দাম দিতে হয় না! ছেলেটি তখন তাকে ধন্যবাদ জানাল এবং মেয়েটির এই মহানুভবতা তাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী করলো। সে প্রতিদান দেয়ার জন্য মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। মহান স্রষ্টা ও মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অনেকগুন বেড়ে গেলো। সেদিনের সেই গরীব ছেলেটিই উনিশ শতকের আমেরিকার বিখ্যাত গাইনোকোলোজিস্ট Dr. Howard Kelly.


… সময়ের পরিক্রমায় সেদিনের সেই মেয়েটি, বয়সকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ডাক্তাররা শত চেষ্টা করেও সারিয়ে তুলতে পারেনি। তাকে আমেরিকার একটি বিখ্যাত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন জটিল রোগ নিয়ে গবেষণা করনে। Dr. Howard Kelly ওই হাসপাতালের একজন গাইনোকোলোজিস্ট ছিলেন এবং তাকে ভদ্রমহিলার চিকিৎসার দায়িত্ব দেয়া নয়। Dr. Howard Kelly যখন সেই রোগীর বিবরণ শুনছিলেন, তখন তাঁর পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি তিনি ওই রোগিণীকে দেখতে যান এবং চিনতে পারেন। চেম্বারে ফিরে এসে মনে মনে স্থির করেন, যেভাবেই হোক এই রোগীকে সারিয়ে তুলবেন। Dr. Howard Kelly, নিজের তক্তাবধানে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর, অবশেষে সেই রোগীর পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে সক্ষম হন। তিনি হিসাব শাখায় ভদ্রমহিলার চিকিৎসার বিলটি তাকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি বিলটি দেখে, চিকিৎসার সকল খরচ পরিশোধ করেন এবং বিলের নিচের অংশে কিছু লিখে রোগিণীর রুমে পাঠিয়ে দেন। প্রথমে সেই মহিলা বিল দেখে আঁতকে উঠেন এবং বুঝতে পারেন সারাজীবনেও এই বিল পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে কোনক্রমে সম্ভব নয়। পরে ভদ্রমহিলার চোখ বিলের নিচের অংশে যায়, সেখানে লেখা ছিল- “Paid in full with one glass of milk.”

এই গল্পটা ইংরেজি ভার্সন হয়তো অনেকেরই শোনা। হাতের কাছে পাওয়া একটা মেডিসিন কোম্পানির লিটারেচার থেকে হুবহু তুলে ধরলাম। গল্পটি প্রায় সত্যি। প্রায় সত্যি বলছি এই কারনে, Dr. Howard Kelly এর জীবনী যিনি লিখেছেন তার লিখায় তিনি বলেছেন, Dr. Howard Kelly কখনো এতো খারাপ অর্থনীতিক অবস্থায় ছিলেন না, যে তাকে কখনো বাড়ি বাড়ি গিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হতো। Dr. Howard Kelly নিজের ভাষায় গ্রীষ্মের দিনে পেনসিলভেনিয়ার হাইকিং করতে গিয়ে এক ফার্মহাউসে পাশে পেয়ে পিপাসা নিবারন করতে গিয়ে মেয়েটির সাথে দেখা। আর বৃদ্ধ অবস্থায় মেয়েটির কেস এমন কমপ্লিকেটেড কিছু ছিল না, Dr. Howard Kelly এমনিতেই প্রতি ৪ জন রোগীতে ১ জনকে ফ্রিতে দেখতেন। এটুকু বাদে বাকি ঘটনাটা সত্যিকারের। কিছু কাহিনী সবসময়ই একটু রঙমাখা, তবুও এমন ভালোবাসার গল্প শুনতে ভালোই লাগে অনেক। কিন্তু Dr. Howard Kelly এর মতো শত শত নাম না জানা ডাক্তার বাংলাদেশে রোগীর চিকিৎসাতে নিজের বিলটা না নিয়ে চেষ্টা করে যান মানুষকে কিছুটা ভালবাসা দিতে। এঁরা বড় হয়েছেন Dr. Howard Kelly এর থেকেও গরীব পরিবেশে, শিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়ছে তাদের। তাঁরা এমনকি বিল না নেয়ার বিনিময়ে রোগীর কাছথেকে এক গ্লাস দুধেরও আশা রাখেন নি। তবুও এই ডাক্তারদের বদনাম হয়, মধ্যসত্ত্বভোগী পরজীবীদের জন্য যারা পুরো স্বাস্থ্যসেবাটাকে একটা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছেন।

 ভাবতে ইচ্ছে হয়, হয়তো একদিন সকলের চোখ খুলবে। অন্ধকার পর্দার আড়ালে থাকা বাংলাদেশের Dr. Howard Kelly দেরকে এরা দেখতে শিখবে।।

০১ জুলাই, ২০১৪

ডায়গনোসিস

কোন এক মঙ্গলবার, জানুয়ারি মাস চলছে তখন। মাস খানেক হয়েছে ইন্টার্ন হিসাবে মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্টের। ফিমেইল এডমিশন টেবিলে বসে আছি। এডমিশন চলছে, পেসেন্টের অপেক্ষা। সকালবেলার একটা সময়ে পেসেন্ট আসার একটা রাশ আওয়ার থাকে, হুড়মুড় করে পেসেন্ট আসতে থাকে। ঐ দিন সময়টা বেশ নিরবেই কাটছিল। হটাত এক রোগিণীর আগমন। মধ্যবয়স্ক মহিলা, সাথে মেয়ের বয়সী আরেকজন। এক্সামিনেসন টেবিলে শুতে বলে রোগীর হিস্ট্রি নিতে গেলাম। মহিলা নিজে কোন কথাই বলতে চান না, সাথের জন আবার কথা বলা শুরু করলে থামতেই চায় না। ধমক দিয়ে মহিলাকে নিজের সমস্যা নিজেই বলতে বললাম, তার ভাষ্য অনুযায়ী সপ্তাহখানিক আগে জ্বর আর হাতের জোড়ায় ব্যথার কারনে গ্রামের এক ডাক্তারকে দেখান তিনি। ডাক্তার দেখে কিছু ওষুধ দেয়ার পর সেটা খাবার পর জ্বর কমে গেছে, কিন্তু মুখে আর হাতের উপর গুটিগুটি কতোগুলো আর মুখের ভিতরে ঘা। “ফিভার উইথ র‍্যাশ” আর “এডভারস ড্রাগ রিএকশন” দুটোকে মাথায় রেখে আরও কিছু প্রশ্ন করলাম, মহিলা কোন উত্তর সোজা ভাবে দিতে চায় না। মুখ দিয়ে কখনো রক্ত গেছে কিনা, কখনো পক্স হয়েছে কিনা আর কোন সমস্যা আছে কিনা এসব প্রশ্নের জবাবে একবার হাঁ বলে, আরেকবার না বলে। হিস্ট্রি শেষ করে ক্লিনিকাল এক্সামিনেসন করতে গিয়ে বিপি মাপতে গিয়ে দেখি প্রেসার ৬০/৪০। নার্সকে দ্রুত আইভি কেনুলা করতে বলে সাথের পুরুষ এটেনড্যান্সকে পাঠালাম আনুশাঙ্গিক জিনিসপত্র আনতে। কথা বলে জানতে পারলাম প্রায় ২ দিন ধরে তার কিছু খেতে ভালো লাগে না, এই কারনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। এদিকে সিস্টার দ্বিধাবোধ করছে, গুটিগুটি দাগ গুলো কিসের না কি, সংক্রামক না আবার। ভাল করে তাকালাম এতক্ষনে মহিলার চেহারার দিকে, দাগগুলোকে টিপিকাল চিকেনপক্সের দাগ বলা যাবে না, কি ডেসক্রিপসন হতে পারে নিজেই বুঝতে পারছি না, একটু পর এসেই স্যার জিজ্ঞেশ করবেন ডেসক্রাইব ইওর কেইস। ম্যাকুলো-প্যাপুলার লেইসন বলেই ডেসক্রাইব করব ভাবলাম, তারপর মুখের ভিতরে ঘা আর জ্বরের জন্য প্রবাব্লি এন্টিবায়োটিক ইনটেকের হিস্ট্রি আছে বলে স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোমেই নিয়ে যাবার কথা চিন্তা করলাম। যেইখানেতে বাঘের ভয়, সেইখানেতেই সন্ধ্যা হয়। বলতে না বলতেই স্যার এসে হাজির। তাও একজন স্যার না, তিন তিন জন স্যার। অগোছালো ভাবে হিস্ট্রি প্রেস্নেন্ট করলাম, নিজের ডায়গনোসিস ও বললাম। স্যাররাও দেখলাম দাগটাকে নিয়ে একটু কনফিউসড। জ্বর আগে না দাগ আগে এই প্রশ্নের উত্তর মহিলা ঠিক ভাবে দিতে পারে না, আবার তার নাকি আগে থেকেই জোড়ায় ব্যথা মাঝেমাঝেই থাকে। এক স্যার হটাত জানতে চাইলেন, এখানে আসলেন কেন? তখন হটাত মহিলা বলে, গতকাল এক ডাক্তার দেখাইসি উনিই প্রেসক্রিপশনে লিখলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগবে। আমি মাঝ থেকে বজ্রাহত, এতক্ষন পর এই কথা বলতেসে মহিলা! সাথের বেশী কথা বলা মহিলাটা এতক্ষনে এনে সেই প্রেসক্রিপসন স্যারের কাছে দিল, উঁকিঝুঁকি মেরে দেখালাম আমাদের মেডিকেলেরই স্কিনভিডির বড় এক স্যার, স্যারের ডায়গনোসিসও স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোম। দেখে নিজের মাঝে একটা আত্মতৃপ্তির বোধ আসলো, যাক চিন্তা ভাবনার লাইনতো ঠিক আছে। স্যাররাও এডভারস ড্রাগ রিএকশন হিসাবে পেসেন্টকে ট্রিট করার সায় দিলেন। রোগিণীর চিকিৎসা হল, সকল এন্টিবায়োটিক বাদ দিয়ে জ্বরের জন্য নাপা সাপোসিটোরি, ফেক্সোফেনাডিন ১৮০গ্রাম, অরাল স্টেরয়েড (স্কিনের স্যারের পরামর্শে), রেনিটিডিন এবং প্রয়োজনে পারএন্টারাল নিউট্রেসন। পরদিন অন্যান্য রোগীদের মতো রোগিণীর রুটিন ইনভেসটিগেসনগুলো (CBC, Urine analysis, Serum Creatinine, RBS etc) হাসপাতালের ল্যাবে পাঠানো হল। রাতে রাউন্ডে গিয়ে যথারীতি প্রায় একই রকম রিপোর্ট দেখলাম সিবিসি নরমাল, ইএসআর একটু বেশী, ইউরিনে কিছু পাস সেল, নো প্রোটিন, নো কাস্ট এরকম রিপোর্ট, সরকারী হাসপাতালের রিপোর্ট যেমন হয়। এদিকে রোগীর লোক আমাদের কথায় গ্রামের ডাক্তার কি ওষুধ দিয়েছিল সেটা এসএমএস করে জোগাড় করেছে। এডভারস ড্রাগ রিএকশন করতে পারে এমন এন্টিবায়োটিক থাকায় আমরা আর ডায়গনোসিস পাল্টানোর কথা ভাবলাম না। ৪/৫ দিন গেলো, রোগীনির কিছুটা ভালো লাগছে। একেতো শীতের সময়, তার উপর হাসপাতালে কেউ থাকতে চায় না। রাউন্ড বা ফলোআপে রোগিণীর পাশে গেলেই তার এক কথা, ওষুধ লিখে ছুটি দিয়ে দিতে। পরে স্যার এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন যেতে চাইলে DOR (ডিসচার্জ অন রিকুয়েস্ট) লিখে ছুটি দিতে। রোগিণী খুশি মনে চলে গেলো, আমরাও ভুলে গেলাম ব্যাপারটা।



সপ্তাহ দুয়েক পর নন-এডমিশন দিনে এডমিশন টেবিলে বসে আছি। রোগিণী আবার হাজির, হাতে ছুটির কাগজটা। তার সিম্পটম আবার দেখা দিয়েছে, কোন কোন ওষুধ আবার খেতে হবে জানতে এসেছে। রোগীর অবস্থা দেখে রোগীকে আবার ভর্তি হতে বললাম, না সে ভর্তি হবে না। ভর্তির বাইরে আমরা কোন রোগীকে কিছু প্রেসক্রাইব করতে পারিনা বলে বহির্বিভাগে আরপির সাথে যোগাযোগ করতে বললাম। ভাবছিলাম আরপি হয়তো তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানাতে পারবে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেই গিয়ে যে সে কই হারিয়ে গেলো আর দেখা গেলো না।
এরও আরও কিছুদিন পর। রোগিণী আবার ভর্তি হল, অন্য একটা মেডিসিন ইউনিটে। এবার সাথে নতুন সিম্পটম, দুদিন ধরে প্রস্রাব প্রায় হয়ই না, রোগিণীর খুব অবস্থা খারাপ। জোড়ায় ব্যথা, মুখে ঘা আর কিডনির সমস্যা সবকিছুকে এক সাথে ফেলে নিগেটিভ সিম্পটমগুলোকে বাদ দিলে একটাই ডায়গনোসিস আসে, লুপাস নেফ্রাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস এরাইথোমেটোসাস (SLE) এর একটা খারাপ প্রেসেন্টেসন। ডায়গনোসিস নিশ্চিত করার জন্য এবার বাইরের ভালো ল্যাবে CBC, Unrine analysis, ANA, anti-ds DNA করার জন্য পাঠানো হল। দুর্ভাগ্য, এসব রিপোর্ট হাতে আসার আগেই রোগিণী মৃত্যুবরণ করেন।

কাজ করে উপলব্ধি একটাই, প্রায় সবসময়ই আপনি যা ভাববেন এটাই সত্যিকারের ডায়গনোসিস। কিছু রোগীর জন্য আপনি কোন ডায়গনোসিস খুঁজে পাবেন না। এরা দ্বার থেকে দ্বার ঘুরবে, কিছু ভালো হয়ে যাবে, কিছু খারাপ। কিন্তু ডায়গনোসিস (মিস-ডায়গনোসিস বলাই ভালো) করা কিছু রোগীর ভাগ্য খারাপের কারনেই হোক, রোগীর নিজের খামখেয়ালীপনার কারনেই হোক অথবা আমাদের কোন ভুলত্রুটির কারনেই হোক, খারাপ কিছু হবে। হয়তো এরকম রোগী ০.০১% এর ও কম। কিন্তু এরাই মনে ১০০% ছাপ রেখে যাবে।

This is why probably we doctors can’t afford to make any mistake, even have to correct the mistake that was not even there.

২৯ জুন, ২০১৪

রমজান ২০১৪



বছরের প্রতিটি সময়ের পিছনে টুকরো কিছু গল্প থাকে। বছর ঘুরে ঐ সময়টা আসলেই সেই গল্পগুলো মনটা দখল করে নিতে চায় জোর করেই। কারো জন্মের মাস ক্যালেন্ডারের পাতায় ভেসে উঠলেই, সে যতই গুরুগম্ভীর মানুষ হউক না কেন ছোটবেলার কথা আবছা ভাবে চলে আসে মনে। রমজান মাসটাই তার কিবা ব্যতিক্রম। 
 


স্কুল বা কলেজ লাইফে রমজান মাসকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার মতো সুযোগ কখনো হয়ে উঠেনি। মাঝেমাঝে বন্ধুদের ইফতার পার্টির দাওয়াত পেতাম, বাস্তব জীবনে চরম অসামাজিক থাকায় প্রায় সব সময়ই অনুপস্থিত থাকা হতো অনুষ্ঠানগুলোতে। এরপর মেডিকেল জীবন, ভর্তির প্রথম বছরে আমাদের আবাসন হিসাবে তখন হোস্টেলের সিট ছেলেদের প্রায় সবার কপালে হয়ে উঠেনি। কলেজ গেটের ওপাশে “সেবা” নামের পাচতালা বিল্ডিংটা ছিল আমাদের এক বছরের আবাসস্থল। ছোটছোট খুপরির মতো রুম, দুজন করে একসাথে থাকা। রমজান মাস আসার আগেই বাসা থেকে সবাই চিন্তিত, খাওয়া দাওয়ার কি হবে। আমাদের খাবার দিয়ে যায় যে খালা উনি আশ্বস্ত করলেন, “মামা, খাওয়াদাওয়ায় কুনু সমস্যা হইব না, আমরা দুপুরে আগের মতোই খাবার দিয়া যামু”। যাই হোক রমজান শুরু হল যথারীতি, নতুন পরিচয় হওয়া কাঁচা বন্ধুদেরকে দেখে খারাপই লাগতো। ক্লাস আর নানান ঝক্কিঝামেলার মাঝে রোজা রাখা এতো বেশ কষ্টের কাজ। চাইতাম, নিজের খাওয়াদাওয়ার কাজটা যতটা পারি ওদের চোখের আড়ালে রাখার। তখন রাতে ঘুমাতাম বেশ সকাল, ঘুম ভাঙ্গত অনেক ভোরে, প্রায়ই রোজাদার বন্ধুদের জাগিয়ে দেয়ার দায়িত্বটা পালন করতাম। এবার অনেকগুলো ইফতার পার্টি চাইলেও পাশ কাটিয়ে যেতে পারিনি বন্ধুদের চাপাচাপিতে।

২য় বর্ষের রমজানটা স্মৃতিতে অনেকটা আবাছা। প্রথম প্রফ পরীক্ষার একেবারেই শেষের দিকে শুরু হওয়া রমজানের কারনে ম্যাক্সিমাম রোজাই বাসায় কাটানো হয়েছে। ততদিনে আমাদের জন্য হোস্টেলের চকচকে নতুন রুম বরাদ্দ হয়েছে। ভাইভার ব্যস্ততায় যে দুই একটা রোজা হোস্টেলে পেলাম, পুরাতন ফ্রেন্ড আর নতুন করে হওয়া রুমমেটদের সাথে একসাথেই।

তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম বর্ষের প্রতিটা রোজার দৃশ্য একই রকম। আর যাই হউক, বন্ধুদের ফেলে খাওয়া যায় না, হোস্টেল লাইফে এটাই শিখলাম। ভোররাতে একজন আরেকজনকে ডেকে ঘুম থেকে জাগানো, একসাথে মিলে ফ্লোরে বসে ইফতার বানানো, অদ্ভুত সব খাবার আইটেম এনে ইফাতারের সময় টেস্ট করা, ড্রিকন্সের বোতল নিয়ে কাড়াকাড়ি করা, কার আনা কোন আইটেম সব থেকে জঘন্য এটা নিয়ে এক জন আরেকজনকে পচানো, কোনদিন দল বেধে ৭ জন মিলে একসাথে প্ল্যান করে বাইরে ইফতার করতে যাওয়া এসব প্রতি বছরের দৃশ্য। দেখতে দেখতে কেউ এক্সপার্ট হয়ে গেলো ট্যাং-এর প্যাক পানি গুলে ড্রিঙ্কস বানাতে, কেউ লেবুর শরবত বানাতে, কেউ কাঁচামরিচ আর পেয়াজ কাটাকাটিতে। শাকভর্তা, হালিম, খিচুড়ি, মিষ্টি, বার্গার, চপ, দই, কুমিল্লার কোন লতাপাতা বাকি ছিলনা আমাদের খাওয়াদাওয়ার মেন্যু থেকে। কখনো ইফতার নিয়ে একজনের সাথে আরেকজনের মনমালিন্য, তো আরেকজন গিয়ে মধ্যস্ততা করে সেটা মিটিয়ে আসা। কখনো কে আজকে ইফতার কিনতে যাবে এটা নিয়ে রাগবিরাগের খেলা। কিন্তু দিনের শেষে আমরা কজন, একসাথে। কখনো হিন্দু মুসলিম এই বিভেদে পড়তে হয়নি, এমনকি আমি কি খাই না খাই এটা ভেবেও ওরা ইফতার বাজার করতে যেত। বাইরের সবাইকেই এই বন্ধুত্বটা বুঝানো খানিকটা কষ্টের ছিল, কিন্তু এই কষ্টটার মাঝেও স্বস্তির কিছু ছিল গত বছরগুলো ধরে।

গতবছর ইন্টার্নী লাইফে ঢুকে সবাই অনেক ব্যস্ত, কিছু বন্ধুর তখন প্রফ ক্লিয়ার হয়নি। তারপরেও তখন বিদায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেনি রমজান মাসে। যতটুকু সম্ভব কাছাকাছিই ছিলাম সবাই সবার। এই বছরটাই প্রথম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলো বিদায় ধ্বনি।
কাছে হোক বা দূরে হোক, একজনের স্মৃতিতে আরেকজন আছি, সান্ত্বনা এটাই। সবাইকে রজমানের শুভেচ্ছা রইল।

২৭ জুন, ২০১৪

প্রফেসনাল এক্সামঃ নতুনে করে পুরনো দিনের কথা

প্রথম প্রফঃ ২০০৯ এর জুলাই মাস, হোস্টেলে থমথমে অবস্থা। কয়েকদিন হল সরকার বদলের। সবার মাঝে চাপা অস্থিরতা। তখন ২১১ নম্বর রুমের বাসিন্দা। পাঁচ রুমমেট আমরা, একেকজন একেক প্রজাতির। তিনজন জানপ্রান দিয়ে পড়ছে। আমি আর হিমেল দুইজন একেতো ফাকিবাজ, তার উপর মনমেজাজ খারাপ, হয় মোবাইলে টিপাটিপি করে বেড়াই, না হয় গল্পবইের দুনিয়াতে ব্যস্ত। সত্যিকথা বলতে ফাস্ট প্রফের আগে যত তিনগোয়েন্দা আর মাসুদরানা পড়া হল, ৫ বছরের মেডিকেলে তার অর্ধেকও পড়া হয়ে উঠেনি। বেশী মানুষ এক সাথে বেশীক্ষণ থাকলে ঝামেলা বাড়ে, প্রফের আগেতো মেজাজ এমনিতেই সবার চড়া, অনেক ঝামেলা অনেক কষ্টের প্রতিটা রাত। এক্সামের ঠিক আগের দিনে কতোগুলো উড়ু সাজেসান আসতো, তবে যার রটে তার কিছুতো বটে। এসব পড়তে গিয়ে অনেকের আগেরদিন রাতের ঘুমটা হারাম হয়ে যেত। তারপরেও খাতায় ছাইপাস কিছু লিখে এসে দুপুরে হোস্টেলের কিছুটা কঠিন, কিছুটা তরল আর কিছুটা বায়বীয় খাবার খেয়ে দুপুরের শান্তির ঘুমের থেকে বড় কিছু ছিল না লাইফে। ঘুমের মাঝে তাড়া করে যেত দুঃস্বপ্নরা, ৫ মার্কের প্রশ্ন ভুল করে এসেছি, দুই মার্কের উত্তর দিয়ে ভুলে গেছি, পাস হবে তো? ৬ দিনের মহাযুদ্ধ পার হয়, ভাইভার রুটিন দিল। স্লাইড দেখা, সাজেসান, কোন এক্সটারনাল আসবে এসব নিয়ে কতো জল্পনা কল্পনা। এনাটমির সফটপার্ট মোটেই সফট না, আমাদের রহিম স্যারের কথাই কানে বাজত বারবার, “দেখবা তোমাদের কিছু ফ্রেন্ডরা পাস করে গেছে, আর কিছু ফ্রেন্ডরা এখনো *** এর ভিসেরা হাতে নিয়ে বসে আছে”। আর হার্ড পার্টে স্লাইড দেখতে মাইক্রোস্কোপের লেন্সের ভিতর দিয়ে তাকানোর বদলে ম্যাক্রোসকপিক ফাইনডিঙ্গস, স্লাইডে ছোট্ট করে লিখা নাম্বার অথবা স্লাইডের আকারআকৃতি দেখার জন্য বাইরে দিয়েই বেশী উঁকিঝুঁকি মারতাম। সেলিমরেজা আর পিন্টুশুভর হিস্টোলোজির কতো পেজ যে ছিঁড়ল পোলাপাইন। ভাইভা দিয়ে এসে ঝুম বৃষ্টি, পোলাপাইনের স্টেমিনার শেষ নাই। হৈচৈ করে হাফ প্যান্ট পরে মাঠে ফুটবল খেলতে গেলো, দুইতালার বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখে ভাবলাম, এইতো জীবন!

এরপর মাসখানেক পার, বাসায় প্রফ পরবর্তী ছুটি কাটিয়ে এর মধ্যেই ওয়ার্ড জীবন শুরু হয়ে গেছে। কোন একটা ছোট্ট ছুটিতে বাসায় যাওয়া, হটাত শুনি রেজাল্ট দিয়ে দিয়েছে, চিটাগাং মেডিকেলের এক মামাকে ফোন দিলে জানা যায় রেজাল্ট। হটাত মনে দুনিয়ার টেনশন, আরে বায়োকেম যে খারাপ দিসি, রেজাল্ট জেনে আর কি হবে। এদিক অদিক করতে করতে ফোন দিলামই শেষ পর্যন্ত, পাস শব্দটা কেমন শুনায় প্রতিটা ভালো খারাপ মেডিকেল স্টুডেন্টদের জীবনে ঠিক ঐ মুহূর্তেই সেটা বোঝা যায়। 





২য় প্রফঃ ২ বছরে কটকটা পাঁচটা সাবজেক্ট পড়ে জিবহার টেস্টবাডগুলো অনেক আগেই অনুভূতিশূন্য। প্রতিক্ষা কেবল “কেমনেতে এই পাঁচ বিষয়ের চক্কর থেকে বার হই”। কেউ কেউ ধরেই নিচেছে, সব সাবজেক্ট একবারে পার করা সম্ভব না, সিলেক্টিভ কিছু সাবজেক্ট ধরে তাই পড়া তাদের। যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন সূচক, ২য় প্রফের শিক্ষকদের মন বুঝে উত্তর দেয়া আসলেই অনেক কঠিন। উপরন্তু এই একটা প্রফ যখন আমরা সবাই বান্দর থাকি, বয়সের দোষ। পুরা ব্যাচ ল্যাপটপ না হয় ডেক্সটপ কিনে ফেলসে ১ম প্রফ পাস করে, হোস্টেল মোটামোটি বসুন্ধরার সিনেপ্লেক্স ছিল গত ২ বছর। কি শান্তি ছিল এই ২ বছরে টের পাওয়া যায় কমিউনিটি মেডিসিন রিটেনের আগে, সত্যি কথা মেজাজি স্যারদের সহানুভূতি রিটেনে না থাকলে যুদ্ধে যাওয়ার আগেই শহীদ হয়ে যাওয়া হতো। ফার্মার ২.৩০ ঘণ্টায় ২০X৩=৬০টা প্রমান সাইজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বন্ধুদের সাথে এক্সাম হলে কথা কাঁটাকাটি করে পুরাই ফ্রাসট্রেটেড। অন্যরকম পরীক্ষা ফরেনসিক, নিজে পুরাই হুমায়ুন আহমেদ। প্যাথলজি আর মাইক্রোতে হল কিছু আদান আর কিছু প্রদানের খেলা। এরপর ভাইভা, সবাই বলে ফাইনাল প্রফের ভাইভা ভীতিকর, ২য় প্রফের কথা কেন জানি সবার স্মৃতি থেকে বাদ পড়ে যায়, হয়তো এটা এতই ইজি অথবা এতই ভীতিকর যে আমরা এটার কথা মনে করে আর কষ্ট পেতে চাই না। সবগুলো মোটামোটি ভালো মতই পার করে দিলাম, ধরা খেলাম শেষের দিন ফার্মা ভাইভা দিতে এসে। আলী স্যারের কাছে শেষ বোর্ডের শেষ পরীক্ষার্থী হিসাবে ভাইভা। শেষ ভালো যার সব ভালো তার, কথাটার সার্থকতা প্রমান করতে গিয়ে শেষটাই খারাপ করলাম। এতো খারাপ ভাইভা আমি লাইফে আর কখনো দেই নাই। স্যার হতাশ হয়ে বললেন, আচ্ছা যাও।
এরপর তো ধরেই নিলাম ২য় প্রফ আর একবারে পার হচ্ছে না। সঙ্গীসাথী অনেক, ২/৩ জন ছাড়া কেউই সব সাবজেক্ট পাসের ব্যাপারে আশাবাদী না। মাস খানেক পর রেসাল্ট দিবে দিবে, ফ্রেন্ডদের রুমে বসে আছি, এমন সময় ফ্রেন্ড রেসাল্ট নিয়ে আসলো। শুনে স্তম্ভিত, ওদের রুমের সবাই ফেল, মাত্র ৪০% এর মতো পাস। কোনভাবে ঐ ৪০% এ আমিও রয়ে গেলাম, কিন্তু ২য় প্রফের রেসাল্ট আর যাই হয়, কাউকে খুশি করে যেতে পারেনি। আপনি হয় কাঁদবেন, কিন্তু হাসবেন না। নিজে পাস করেও যে মনে কতোটা অপূর্ণতা থেকে যায়, ২য় প্রফে এসে বুঝা যায়। আলী স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ রয়ে গেলাম, এতো খারাপ ভাইভা দিয়েও পাস এটা ভাবতে এখনো অবাক লাগে মাঝে মাঝে।

ফাইনাল প্রফের কাহিনী আর নাই বলি, জানুয়ারির ৪/৬ ডিগ্রি টেম্পারেচারের ভোরে বরফ শীতল পানিতে ২ ঘণ্টার ঘুম থেকে জেগে হাতমুখ ধোওয়ার গল্প আর যাই হোক, এই গরমের জুলাই মাসে মানায় না।

এতোকিছু লিখার একটাই কারন, ৩ দিন পর প্রফ পরীক্ষা। এটা হতাশার গল্প না, অনুপ্রেরণার গল্পও না। এতো হতাশ হবেন না, আবার খুব বেশী খুশিও হবেন না। যে যেমন কষ্ট করে গেছেন, তার প্রতিদান অবশ্যই পাবেন।
যারা হতাশাগ্রস্ত তাদের জন্য, অনেকসময় কষ্টের পরেও কষ্টের আশানুরূপ ফল আসে না, আবার অনেকে দেখবেন প্রত্যাশার চেয়ে বেশী কিছু পেয়ে গেছে। এটা নিয়ে ভাববেন না, নিজেকে নিজের মাপকাঠিতেই শুধুমাত্র দেখবেন। আপনার সিনিয়ররা সবাই পাস করে গেছেন, আপনিও কখনো থেমে থাকবেন না। মেডিকেল লাইফটা তো শুধু এই কয়েকটা পরীক্ষা নিয়ে না।
যারা অনেক ভালো রেজাল্টের প্রত্যাশী, তাঁদেরকে সবার বাইরে কিছু করতে হবে যা শুধু সময় আর ভাগ্যই বলে দিবে। আপনাকে শুধু এটা ঠিক সময়ে ঠিক ভাবে বুঝে নিতে হবে মাত্র।

সবাইকে প্রফের জন্য শুভকামনা রইল। সবার মনকামনা পূর্ণ হোক।

৩১ মে, ২০১৪

বিশ্ব তামাকবিরোধী দিবস ২০১৪

ছোটবেলায় লাল, নীল নানাবর্ণের সিগারেট লাইটার জমাতে খুব ভালো লাগতো। আমার এক দাদু, যিনি অনেকটা চেইন স্মোকার ছিলেন, তাঁর কল্যাণে আমার এই লাইটারের কালেকশন বেশ ভালই ছিল। কিভাবে একটা স্পার্ক থেকে আগুণ জ্বলে উঠে এই অদ্ভুত জিনিসটা আমাকে সবসময়ই আকর্ষণ করতো। কিন্তু বলাই বাহুল্য, যতবার আমার এই কালেকশন মায়ের হাতের কাছে পড়তো ততবারই লাইটারগুলোর জায়গা হতো রাস্তার পাশের ড্রেইনে। মায়ের মনে একটা অদ্ভুত ধারনা ছিল, যে ছেলের হাতে ছোট বয়সে লাইটার পড়লে সে বড় হলে সিগারেট খাওয়া শুরু করে দিবে। বারবার প্রতিবাদ করতাম, করে আবার জমানো শুরু করতাম চুপিচুপি করে। কিন্তু কে শুনত কার কথা। প্রতিবারই লাইটারগুলো হারিয়ে যেত মায়ের হাতের ছোঁওয়ায়। একসময় বিরক্ত হয়েই হার স্বীকার করলাম। এরপর স্কুলজীবনের মাঝামাঝি সময়ে এসে একদল বন্ধুকে দেখলাম, ক্লাসব্রেকের সময়ে কোথায় জানি হারিয়ে যেতে। একসময় খুঁজেপেতে আবিষ্কার করলাম কি হয় এই সময়ে। স্মোকারদের খুব ভালো স্বভাব হচ্ছে এরা অনেক শেয়ারিং মাইন্ডেড, কিন্তু মনের খচখচানিতে কখনো এই শেয়ারের ভাগীদার হওয়ার ইচ্ছে জাগেনি, হয়তো ছোটবেলার লাইটারের শিক্ষে। স্কুল জীবনে শুরু হয় ফ্রেন্ডের শেয়ারিং থেকে, কলেজে জীবনে সেই মেয়েটাকে ইম্প্রেস করতে গিয়ে আর মেডিকেল লাইফে ফ্রাসট্রেসন কাটাতে গিয়ে। মেডিসিন ওয়ার্ডে প্রতি এডমিসনে গড়ে ১টা করে শ্বাসকষ্ট, বুক ব্যাথার পেসেন্ট পেতাম যাদের ফাইনাল ডায়গনসিস হতো ফুসফুসের ক্যান্সার। হিস্ট্রি নিতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখতাম, মেয়েরাও বিড়ি সিগারেট খেতে কম যায় না। নিজের ডিসিশন অন্যের উপর দিয়ে চালিয়ে দেয়ার বদ একটা স্বভাব আছে আমার, এক স্বভাব নিয়ে মাঝে তখনই শুধু ভালো লাগে যখন রিকশাওয়ালাকে চাপ দিয়ে রিকশা চড়া অবস্থায় অন্তত সিগারেট খাওয়াটা বাদ দেয়াতে পারি। দুদিন আগেই, সামনে বাজেটে সিগারেটের উপর ট্যাক্স বাড়ানোর জন্য খোলা একটা ফেসবুকে ইভেন্টে আমাদের জুনিয়র একটা মেয়ের পোস্ট দেয়ার পর তাঁর পোস্টের প্রতিবাদে কমেন্ট দেখে বুঝতে পারলাম, রিকশাওয়ালারাও অনেক কিছু বুঝে যা আমাদের মাঝে অনেকেই বুঝে না।



শেষ করার আগে আরেকটা গল্প। গল্পটা আমাদের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের প্রফেসর ডাঃ মান্নান স্যারের, ওয়ার্ডে তাঁর মুখে শোনা। ওয়ার্ড রাউন্ড দিতে দিতে হটাত এক্সিডেন্টাল লাইম (চুন) পয়সনিং এর বাচ্চাকে দেখে স্যারের মুখে তাঁর মায়ের আর বউের কথা আসলো। স্যারের মা অনেকটা সৌখিন স্বভাবের, মেডিকেলের ব্যস্ততার জীবনের মাঝে স্যার যতবার বাড়িতে যেতেন, ভরপেট খাওয়ার পর স্যারের মা বিরাট একটা পানের বাটা নিয়ে ছেলের পাশে বসতেন, বসে নানান মশলা, চুন, জর্দা মেশানো এক খিলি পান স্যারকে খাওয়ানোর পর দুজনের গল্প হতো। একসময় স্যারের বয়স বাড়লো, স্যার মায়ের পছন্দে বিয়েও করলেন। বিয়ের পরদিন রাতে খাবার পর স্যারের মা যথারীতি স্যারের জন্য পান বানাতে বসলেন, তখন স্যারের বউ এসে স্যারের মায়ের কাছ থেকে পানের বাটা নিয়ে গিয়ে বললেন, "মা, আমার জামাইকে আমি আর পান খাওয়াতে দিবনা।" এটা প্রায় ৩০ বছর আগের কথা, এরপর থেকে স্যারের আর পান খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি! বাই দি ওয়ে, এতো কথা বলার পর স্যার শুধু বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়েই ডায়গনসিস করলেন যে চুনটা শুধু বাচ্চাটার মুখের কিছু লোকাল ইঞ্জুরি করেছে, পেটের ভিতর যায়নি। স্যারের ভাষায়, ৩০ বছর আগে আমার মুখের ভিতরটা দেখলে তোমরা বুঝতে পারতা যে, পান চুন কতো ভয়ঙ্কর।
আজ বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস, একটা দিন ভালো লাগার মানুষটার কথা শুনুন, একটা দিন থেকে বদলে যেতে পারে সব কয়টা দিন।
বাদবাকি যারা সিগারেট খান না, চুনপান কিছুই খান না: অনেকসময় আমরা কাছের মানুষের অনেক কিছু দেখেও এড়িয়ে যাই। বাইরের মানুষকে বুঝানোর আগে নিজের কাছের মানুষকেই বুঝানো সবার আগে দরকার। আমি ও মাঝে মাঝে চেষ্টায় থাকি, কতোটুকু কাজে আসে জানিনা, তবুও লেগে থাকি। হয়তো কোন সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়...