• ডাঃ লালা সৌরভ দাস,কনসালটেন্ট এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, এখন থেকে সিলেটের সোবহানীঘাটে ওয়েসিস হাসপাতালে ছুটির দিন বাদে বিকেল ৫টা - ৮টা রোগী দেখবেন।

  • শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলুন

    মানবদেহের সংক্রামক রোগসমূহ আমাদের দেহে প্রবেশ করে অপরিষ্কার পরিবেশে জীবনযাপনের জন্য। এমনকি সংক্রামক নয় এমন রোগসমূহও প্রবল আকার ধারন করে এমন পরিবেশে। তাই নিজের, পরিবারের এবং সমাজের সবার নিরাপত্তার স্বার্থে পরিষ্কার পরিছন্নতায় গুরুত্ব দিন।

  • শাঁকসবজি সহ পুষ্টিকর সুষম খাদ্যতালিকা মেনে খাবার গ্রহন করুন

    ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বি বৃদ্ধি, দেহের ওজন বৃদ্ধি, ক্যান্সার সহ নানা সমস্যার সমাধান দিতে পারে সুষম খাদ্যতালিকা মেনে পরিমিত পরিমানে খাবার গ্রহনের অভ্যাসটি। এরই সাথে নিয়মিত ব্যায়াম, শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুম অত্যাবশ্যক।

  • বাসায় নিয়মিত ডায়াবেটিস পরিমাপের গুরুত্ব

    ডায়াবেটিস রোগীর নিজের রক্তের সুগার নিজে পরিমাপের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন ডায়াবেটিস রোগী নিজের রক্তের সুগার মেনে নিজেই বুঝতে পারেন তা নিয়ন্ত্রনের মাঝে আছে কিনা এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তের সুগার অতিরিক্ত কমে যাওয়া) নির্ণয় করে তা প্রতিরোধ করতে পারেন।

  • 1st BES-MAYO Advance Course in Endocrinology in Bangladesh

    The mid of 2018 brings an exciting news for Bangladeshi Endocrinologists. Mayo Clinic, a nonprofit academic medical center based in Rochester, Minnesota, focused on integrated clinical practice, education, and research and also world's number one Endocrine center is going to arrange a "Advance Course in Endocrinology" in collaboration with Bangladesh Endocrine Society on 24th-25th January, 2019

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

প্রায় তিন দশক আগের কথা, ২৬ জুলাই ১৯৮২। ৩১ বছর বয়সী তরুন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটিতে একটি শুটিং স্পটে একশন দৃশ্যে অভিনয় করছেন মনমোহন দেশাই-এর বিখ্যাত “কুলি” ছবির জন্য। সে জামানায় একশন দৃশ্যের জন্য স্টান্টম্যানের ব্যবহার এতো বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেনি, অভিনেতারা নিজেরাই চালিয়ে যেতেন বিপদজনক এই কাজ। একটি একশন দৃশ্যে অভিনয়কালে সঠিক সময়ের আগেভাগেই জাম্প দিয়ে গুরুতর আহত হলেন তিনি। গুরুতর আহত নায়ককে ব্যাঙ্গালোরে প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত নিয়ে আসা হল মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হসপিটালে। ডাক্তার জানালেন পেটের ভিতরে প্রচুর অভ্যন্তরীণ রক্তপাত হয়ে রোগীর অবস্থা আশংকাজনক, দ্রুত কয়েক ব্যাগ রক্ত লাগবে। তড়িঘড়ি করেই রক্ত জোগাড় করা হল, রক্ত জোগাড় করে অপারেশন থিয়েটারে দ্রুত ইমারজেন্সি স্প্লিনেকটমি করা হল এই মহানায়কের। এরপর দিন গেলো, স্রষ্টার কৃপায় ধীরে ধীরে অল্পঅল্প করে সুস্থ হতে থাকলেন তিনি। এরপর বহুবছর কেটে গেলো। আগের ঘটনার পর থেকে নায়ক স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে প্রায়ই রুটিন চেক-আপ করতে যেতেন ডাক্তারের কাছে। ৮ বছর পর লিভারের কিছু এবনরমাল টেস্ট রেজাল্ট দেখে ডাক্তারের সন্দেহ হল। আরও বিস্তারিত পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়লো নায়কের লিভার সিরোসিস (বাংলায় বলতে গেলে, যকৃতের প্রায় চিরস্থায়ী একটা রোগ যার কারনে যকৃতের ক্ষমতা ক্রমাগত কমে গিয়ে পুষ্টি উপাদানগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং যা পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে)। নায়ক অবাক হলেন, লিভার সিরোসিস রোগ এলকোহলিকদের মাঝে বেশী। তিনি তাঁর জীবনে মদ্যপানের স্বভাবটাকে ঘৃণা করে কঠিনভাবে একে সর্বদা বর্জন করে গেছেন। তবে কেন তাঁর এই রোগ? পরে দেখা গেলো তাঁর লিভার সিরোসিস এর কারন ভাইরাল হেপাটাইটিস। কবে কি ভাবে এই ভাইরাসের শিকার হলেন তিনি? এরও উত্তর পাওয়া গেলো, সেই মেসিভ ব্লাড ট্রান্সফিউসনের হিস্ট্রি থেকে। তখনকার দিনে হেপাটাইটিসের জন্য রক্তদানের আগে এন্টিজেন টেস্টগুলো ছিল অপ্রতুল, আর এতো অল্পসময়ে এতো বিশাল পরিমানের রক্ত লেগেছিল নায়কের যে হয়তো কোন রক্তের ব্যাগ বাদ পড়ে যায় পর্যাপ্ত পরীক্ষা থেকে। এখনো নায়ককে লিভার সিরোসিসের জন্য প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিয়ে যেতে হচ্ছে...





পুরো ঘটনাটা গল্পের মতো, বাস্তবে হরহামেশা এই গল্প নতুন করে লিপিবদ্ধ হচ্ছে। হেপাটাইটিস এখন মেডিসিনের এক অন্যতম রোগ। কিছু হেপাটাইটিস খুবই সাধারণ। বাইরে হয়তো খেতে গিয়ে ওয়েটারের দেয়া অপরিষ্কার পানির গ্লাস থেকেই হয়তো আক্রান্ত হবেন আপনি। দুর্বল আর হলুদবর্ণ ধারণ করে একমাস ঘরের ভিতর শুয়ে বসে থেকে বাংলাদেশের প্রন্থা অনুযায়ী তেলমশলা কম দেয়া বিস্বাদের খাবার খেয়ে ঠিকই ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু বিপদজনক প্রজাতির হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো রক্তের আদানপ্রদান, শারীরিক সম্পর্ক অথবা ড্রাগ নিডেলের মাধ্যমে আপনার দেহকে আক্রান্ত করে হয়তো বুঝতেই দিবে না যে আপনি অসুস্থ। নীরবে বাসা বানিয়ে আপনার দেহকে শেষ করে ঠিক শেষ মুহূর্তে জানান দিবে এই যে আমি তোমার চিরসঙ্গী ছিলাম চুপিচুপি।

স্কুলে যাবার পর থেকেই বাইরের খাবারের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ মেটাতে লুকিয়েচুরিয়ে বাইরে খাওয়া, হয়তো সেই খাওয়া থেকে জন্ডিস। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল, পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তার সাহেব জানালেন এক মাসের বিশ্রাম নিতে, এটাই নাকি চিকিৎসা। তখন ক্লাস ৬/৭ এ পড়ি। একমাসের বিশ্রাম মানে একমাসের স্কুল ছুটি। আমাকে আর কে পায়! অনেক বড় রোগীর মতো মুখ ভার করে বিছানায় শুয়ে থাকি, আত্মীয়স্বজনরা এসে দেখে যান। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে বেশ কিছু গল্পের বইও জোগাড় করে ফেললাম, সময়টা ভালোই কাটল। শুধু যন্ত্রণার ছিল খাওয়াদাওয়াটা, মুখের স্বাদটাতো নাই বললেই চলে, তার উপর আমার জন্য রান্নাতে তেলমশলার চরম ঘাটতি। এরমাঝে কে জানি পরামর্শ দিলে আয়ুর্বেদিক কোন ঔষধে নাকি জন্ডিসটা তাড়াতাড়ি কমে যায়। এক বোতল সেই ঔষধটাও জোগাড় করা হল, ঔষধের রঙটা দেখে আমার চীৎকারে অতঃপর আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সেইখানেই সমাপ্তি। ইতিমধ্যে আমার এক মামাতো বোন আমাদের পরিবার থেকে প্রথম ডাক্তারনী হয়ে বের হয়েছে। সে মা বাবাকে বুদ্ধি দিল, কোত্থেকে কোন ভ্যাক্সিনেশন করালে নাকি এই রোগের আরও খারাপ জাতভাই থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আমিও প্রথম প্রথম অনেক আগ্রহ নিয়ে গেলাম ভ্যাক্সিনেশন করাতে, প্রথমবার সূইের খোঁচাতেই আগ্রহ মিটে গেলো। তারপরও ডাক্তারবোনের জোরাজোরিতে পুরো ডোসটা শেষ করতে বাধ্য হতে হয়। এখনো মেডিকেলে অনেককেই দেখি ডাক্তার হয়ে গেছে, কিন্তু হেপাটাইটিসের ভ্যাক্সিনেশনটা করা নেই। তখন মামাতো বোনের ডাক্তারির কথাটা মনে চলে আসে।

এখন সরকার ছোট বাচ্চাদের ভ্যাক্সিনেশনে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিনটাকে যোগ করে দিয়েছে বিনামূল্যে। কিন্তু আমার ফ্রেন্ডলিস্টের প্রায় সবাই নব্বইের দশকের অথবা তারও আগের, তখন এই ভ্যাক্সিন সরকারের বিনামূল্যে প্রদানকারী ভ্যাক্সিনগুলোর তালিকায় ছিল না। তাই এমন মানুষ হয়তো কম হবে না যাদের এখনো ভ্যাক্সিন নেয়া হয়নি। ভ্যাক্সিন নিতে হয়তো কিছু টাকা বের হয়ে যাবে পকেট থেকে, তারপরও সামান্য সতর্কতাই অনেক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিবে আপনাকে। হেপা-এ এবং হেপা-বি এই দুই ভাইরাসের প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন আছে, সব থেকে খারাপ হেপা-সির প্রতিরোধে এখনো কোন ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই নিকটআত্মীয়র বাইরে কারো থেকে রক্তগ্রহনে বিশেষ সতর্কতা নিন, ধর্মীয় অনুশাসনের কোন বিকল্প নেই। এমনকি সেলুনে চুল কাটতে অথবা সেভ করতে গেলে নতুন ব্লেড কেনার টাকা দরকার হলে নিজের পকেট থেকে দিয়ে হলেও পূর্বব্যবহৃত ব্লেড বদলাতে বাধ্য করুন। ডাক্তার যারা আছেন, তাঁদের কাছে মামার বাড়ির গল্প গাইবো না। হেপাটাইটিস অথবা এইচআইভিযুক্ত হাইলি ডেঞ্জারাস ইনফেক্সাস রোগীকে কিভাবে ডিল করতে হয় এটা না জেনে কেউ পাস করে না। যদি মিস হয়ে যায় অথবা ভুলে গিয়ে থাকেন তো আরেকবার স্মরণ করে নিবেন।

যারা সন্ধানী/মেডিসিন ক্লাব/রক্তদান কর্মসূচীর সাথে জড়িত, তাদের সবথেকে বড় ভূমিকা হতে পারে মানুষকে একটুখানি সচেতন করে তোলায়। একটা ব্যবহারকৃত নিডলের মাঝে এইডস এর জীবাণু এইচআইভি আর হেপাটাইটিস দুটো জীবাণু থাকলে সেই নিডেল দিয়ে যদি প্রিক খান তবে আপনার এইডস হওয়ার যতটা না চান্স থাকবে তার থেকে প্রায় ১০০গুন বেশী চান্স থাকবে হেপাটাইটিস দিয়ে আক্রান্ত হবার। নিজের গরজে একটু স্যারদের জিজ্ঞেশ করে হলেও জেনে নিন, হেপাটাইটিস বি এর সংক্রামণে কি করবেন, হেপাটাইটিস সি এর সংক্রামণে কি করবেন। নিজে জেনে নিলে হয়তো নিজের সাথে অন্যদের জানার ঘাটতিটাও পূরণ করে দিতে পারবেন।

এতোকিছু বলার কারন আজকে “বিশ্ব যকৃত প্রদাহ দিবস”। নাহ, “বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস” এই বাংলিশটাই ভালো শোনায়। ঈদের খাবার খেতে গিয়ে পরিষ্কার পরিছন্নতায় এবার তাই হয়তো একটু বেশিই খেয়াল রাখবেন। সবাইকে আবারো ঈদের শুভেচ্ছা রইলো।।
Share:

ডাক্তার এবং কৃতজ্ঞতার কার্পণ্য

এক গরিব বালক স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়িতে বাড়িতে পণ্য বিক্রি করতো। একদিন সে খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঠিক করলো পরবর্তী বাড়িতে গিয়ে খাবার চাইবে। দরজার কড়া নাড়ার পর এক মেয়ে বেরিয়ে এল। সে হতভম্ব হয়ে খাবারের পরিবর্তে এক গ্লাস পানি চাইল। মেয়েটি ক্ষুধার্ত ছেলেটিকে দেখে পানির পরিবর্তে এক গ্লাস দুধ দিল। সে পরিপূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধপান করলো এবং বলল, আপনাকে কতো দাম দিতে হবে? মেয়েটি বলল, মা শিখিয়েছে ভালোবেসে কিছু দিলে দাম দিতে হয় না! ছেলেটি তখন তাকে ধন্যবাদ জানাল এবং মেয়েটির এই মহানুভবতা তাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী করলো। সে প্রতিদান দেয়ার জন্য মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। মহান স্রষ্টা ও মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অনেকগুন বেড়ে গেলো। সেদিনের সেই গরীব ছেলেটিই উনিশ শতকের আমেরিকার বিখ্যাত গাইনোকোলোজিস্ট Dr. Howard Kelly.


… সময়ের পরিক্রমায় সেদিনের সেই মেয়েটি, বয়সকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ডাক্তাররা শত চেষ্টা করেও সারিয়ে তুলতে পারেনি। তাকে আমেরিকার একটি বিখ্যাত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন জটিল রোগ নিয়ে গবেষণা করনে। Dr. Howard Kelly ওই হাসপাতালের একজন গাইনোকোলোজিস্ট ছিলেন এবং তাকে ভদ্রমহিলার চিকিৎসার দায়িত্ব দেয়া নয়। Dr. Howard Kelly যখন সেই রোগীর বিবরণ শুনছিলেন, তখন তাঁর পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি তিনি ওই রোগিণীকে দেখতে যান এবং চিনতে পারেন। চেম্বারে ফিরে এসে মনে মনে স্থির করেন, যেভাবেই হোক এই রোগীকে সারিয়ে তুলবেন। Dr. Howard Kelly, নিজের তক্তাবধানে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর, অবশেষে সেই রোগীর পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে সক্ষম হন। তিনি হিসাব শাখায় ভদ্রমহিলার চিকিৎসার বিলটি তাকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি বিলটি দেখে, চিকিৎসার সকল খরচ পরিশোধ করেন এবং বিলের নিচের অংশে কিছু লিখে রোগিণীর রুমে পাঠিয়ে দেন। প্রথমে সেই মহিলা বিল দেখে আঁতকে উঠেন এবং বুঝতে পারেন সারাজীবনেও এই বিল পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে কোনক্রমে সম্ভব নয়। পরে ভদ্রমহিলার চোখ বিলের নিচের অংশে যায়, সেখানে লেখা ছিল- “Paid in full with one glass of milk.”

এই গল্পটা ইংরেজি ভার্সন হয়তো অনেকেরই শোনা। হাতের কাছে পাওয়া একটা মেডিসিন কোম্পানির লিটারেচার থেকে হুবহু তুলে ধরলাম। গল্পটি প্রায় সত্যি। প্রায় সত্যি বলছি এই কারনে, Dr. Howard Kelly এর জীবনী যিনি লিখেছেন তার লিখায় তিনি বলেছেন, Dr. Howard Kelly কখনো এতো খারাপ অর্থনীতিক অবস্থায় ছিলেন না, যে তাকে কখনো বাড়ি বাড়ি গিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হতো। Dr. Howard Kelly নিজের ভাষায় গ্রীষ্মের দিনে পেনসিলভেনিয়ার হাইকিং করতে গিয়ে এক ফার্মহাউসে পাশে পেয়ে পিপাসা নিবারন করতে গিয়ে মেয়েটির সাথে দেখা। আর বৃদ্ধ অবস্থায় মেয়েটির কেস এমন কমপ্লিকেটেড কিছু ছিল না, Dr. Howard Kelly এমনিতেই প্রতি ৪ জন রোগীতে ১ জনকে ফ্রিতে দেখতেন। এটুকু বাদে বাকি ঘটনাটা সত্যিকারের। কিছু কাহিনী সবসময়ই একটু রঙমাখা, তবুও এমন ভালোবাসার গল্প শুনতে ভালোই লাগে অনেক। কিন্তু Dr. Howard Kelly এর মতো শত শত নাম না জানা ডাক্তার বাংলাদেশে রোগীর চিকিৎসাতে নিজের বিলটা না নিয়ে চেষ্টা করে যান মানুষকে কিছুটা ভালবাসা দিতে। এঁরা বড় হয়েছেন Dr. Howard Kelly এর থেকেও গরীব পরিবেশে, শিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়ছে তাদের। তাঁরা এমনকি বিল না নেয়ার বিনিময়ে রোগীর কাছথেকে এক গ্লাস দুধেরও আশা রাখেন নি। তবুও এই ডাক্তারদের বদনাম হয়, মধ্যসত্ত্বভোগী পরজীবীদের জন্য যারা পুরো স্বাস্থ্যসেবাটাকে একটা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছেন।

 ভাবতে ইচ্ছে হয়, হয়তো একদিন সকলের চোখ খুলবে। অন্ধকার পর্দার আড়ালে থাকা বাংলাদেশের Dr. Howard Kelly দেরকে এরা দেখতে শিখবে।।
Share:

ডায়গনোসিস

কোন এক মঙ্গলবার, জানুয়ারি মাস চলছে তখন। মাস খানেক হয়েছে ইন্টার্ন হিসাবে মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্টের। ফিমেইল এডমিশন টেবিলে বসে আছি। এডমিশন চলছে, পেসেন্টের অপেক্ষা। সকালবেলার একটা সময়ে পেসেন্ট আসার একটা রাশ আওয়ার থাকে, হুড়মুড় করে পেসেন্ট আসতে থাকে। ঐ দিন সময়টা বেশ নিরবেই কাটছিল। হটাত এক রোগিণীর আগমন। মধ্যবয়স্ক মহিলা, সাথে মেয়ের বয়সী আরেকজন। এক্সামিনেসন টেবিলে শুতে বলে রোগীর হিস্ট্রি নিতে গেলাম। মহিলা নিজে কোন কথাই বলতে চান না, সাথের জন আবার কথা বলা শুরু করলে থামতেই চায় না। ধমক দিয়ে মহিলাকে নিজের সমস্যা নিজেই বলতে বললাম, তার ভাষ্য অনুযায়ী সপ্তাহখানিক আগে জ্বর আর হাতের জোড়ায় ব্যথার কারনে গ্রামের এক ডাক্তারকে দেখান তিনি। ডাক্তার দেখে কিছু ওষুধ দেয়ার পর সেটা খাবার পর জ্বর কমে গেছে, কিন্তু মুখে আর হাতের উপর গুটিগুটি কতোগুলো আর মুখের ভিতরে ঘা। “ফিভার উইথ র‍্যাশ” আর “এডভারস ড্রাগ রিএকশন” দুটোকে মাথায় রেখে আরও কিছু প্রশ্ন করলাম, মহিলা কোন উত্তর সোজা ভাবে দিতে চায় না। মুখ দিয়ে কখনো রক্ত গেছে কিনা, কখনো পক্স হয়েছে কিনা আর কোন সমস্যা আছে কিনা এসব প্রশ্নের জবাবে একবার হাঁ বলে, আরেকবার না বলে। হিস্ট্রি শেষ করে ক্লিনিকাল এক্সামিনেসন করতে গিয়ে বিপি মাপতে গিয়ে দেখি প্রেসার ৬০/৪০। নার্সকে দ্রুত আইভি কেনুলা করতে বলে সাথের পুরুষ এটেনড্যান্সকে পাঠালাম আনুশাঙ্গিক জিনিসপত্র আনতে। কথা বলে জানতে পারলাম প্রায় ২ দিন ধরে তার কিছু খেতে ভালো লাগে না, এই কারনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। এদিকে সিস্টার দ্বিধাবোধ করছে, গুটিগুটি দাগ গুলো কিসের না কি, সংক্রামক না আবার। ভাল করে তাকালাম এতক্ষনে মহিলার চেহারার দিকে, দাগগুলোকে টিপিকাল চিকেনপক্সের দাগ বলা যাবে না, কি ডেসক্রিপসন হতে পারে নিজেই বুঝতে পারছি না, একটু পর এসেই স্যার জিজ্ঞেশ করবেন ডেসক্রাইব ইওর কেইস। ম্যাকুলো-প্যাপুলার লেইসন বলেই ডেসক্রাইব করব ভাবলাম, তারপর মুখের ভিতরে ঘা আর জ্বরের জন্য প্রবাব্লি এন্টিবায়োটিক ইনটেকের হিস্ট্রি আছে বলে স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোমেই নিয়ে যাবার কথা চিন্তা করলাম। যেইখানেতে বাঘের ভয়, সেইখানেতেই সন্ধ্যা হয়। বলতে না বলতেই স্যার এসে হাজির। তাও একজন স্যার না, তিন তিন জন স্যার। অগোছালো ভাবে হিস্ট্রি প্রেস্নেন্ট করলাম, নিজের ডায়গনোসিস ও বললাম। স্যাররাও দেখলাম দাগটাকে নিয়ে একটু কনফিউসড। জ্বর আগে না দাগ আগে এই প্রশ্নের উত্তর মহিলা ঠিক ভাবে দিতে পারে না, আবার তার নাকি আগে থেকেই জোড়ায় ব্যথা মাঝেমাঝেই থাকে। এক স্যার হটাত জানতে চাইলেন, এখানে আসলেন কেন? তখন হটাত মহিলা বলে, গতকাল এক ডাক্তার দেখাইসি উনিই প্রেসক্রিপশনে লিখলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগবে। আমি মাঝ থেকে বজ্রাহত, এতক্ষন পর এই কথা বলতেসে মহিলা! সাথের বেশী কথা বলা মহিলাটা এতক্ষনে এনে সেই প্রেসক্রিপসন স্যারের কাছে দিল, উঁকিঝুঁকি মেরে দেখালাম আমাদের মেডিকেলেরই স্কিনভিডির বড় এক স্যার, স্যারের ডায়গনোসিসও স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোম। দেখে নিজের মাঝে একটা আত্মতৃপ্তির বোধ আসলো, যাক চিন্তা ভাবনার লাইনতো ঠিক আছে। স্যাররাও এডভারস ড্রাগ রিএকশন হিসাবে পেসেন্টকে ট্রিট করার সায় দিলেন। রোগিণীর চিকিৎসা হল, সকল এন্টিবায়োটিক বাদ দিয়ে জ্বরের জন্য নাপা সাপোসিটোরি, ফেক্সোফেনাডিন ১৮০গ্রাম, অরাল স্টেরয়েড (স্কিনের স্যারের পরামর্শে), রেনিটিডিন এবং প্রয়োজনে পারএন্টারাল নিউট্রেসন। পরদিন অন্যান্য রোগীদের মতো রোগিণীর রুটিন ইনভেসটিগেসনগুলো (CBC, Urine analysis, Serum Creatinine, RBS etc) হাসপাতালের ল্যাবে পাঠানো হল। রাতে রাউন্ডে গিয়ে যথারীতি প্রায় একই রকম রিপোর্ট দেখলাম সিবিসি নরমাল, ইএসআর একটু বেশী, ইউরিনে কিছু পাস সেল, নো প্রোটিন, নো কাস্ট এরকম রিপোর্ট, সরকারী হাসপাতালের রিপোর্ট যেমন হয়। এদিকে রোগীর লোক আমাদের কথায় গ্রামের ডাক্তার কি ওষুধ দিয়েছিল সেটা এসএমএস করে জোগাড় করেছে। এডভারস ড্রাগ রিএকশন করতে পারে এমন এন্টিবায়োটিক থাকায় আমরা আর ডায়গনোসিস পাল্টানোর কথা ভাবলাম না। ৪/৫ দিন গেলো, রোগীনির কিছুটা ভালো লাগছে। একেতো শীতের সময়, তার উপর হাসপাতালে কেউ থাকতে চায় না। রাউন্ড বা ফলোআপে রোগিণীর পাশে গেলেই তার এক কথা, ওষুধ লিখে ছুটি দিয়ে দিতে। পরে স্যার এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন যেতে চাইলে DOR (ডিসচার্জ অন রিকুয়েস্ট) লিখে ছুটি দিতে। রোগিণী খুশি মনে চলে গেলো, আমরাও ভুলে গেলাম ব্যাপারটা।



সপ্তাহ দুয়েক পর নন-এডমিশন দিনে এডমিশন টেবিলে বসে আছি। রোগিণী আবার হাজির, হাতে ছুটির কাগজটা। তার সিম্পটম আবার দেখা দিয়েছে, কোন কোন ওষুধ আবার খেতে হবে জানতে এসেছে। রোগীর অবস্থা দেখে রোগীকে আবার ভর্তি হতে বললাম, না সে ভর্তি হবে না। ভর্তির বাইরে আমরা কোন রোগীকে কিছু প্রেসক্রাইব করতে পারিনা বলে বহির্বিভাগে আরপির সাথে যোগাযোগ করতে বললাম। ভাবছিলাম আরপি হয়তো তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানাতে পারবে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেই গিয়ে যে সে কই হারিয়ে গেলো আর দেখা গেলো না।
এরও আরও কিছুদিন পর। রোগিণী আবার ভর্তি হল, অন্য একটা মেডিসিন ইউনিটে। এবার সাথে নতুন সিম্পটম, দুদিন ধরে প্রস্রাব প্রায় হয়ই না, রোগিণীর খুব অবস্থা খারাপ। জোড়ায় ব্যথা, মুখে ঘা আর কিডনির সমস্যা সবকিছুকে এক সাথে ফেলে নিগেটিভ সিম্পটমগুলোকে বাদ দিলে একটাই ডায়গনোসিস আসে, লুপাস নেফ্রাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস এরাইথোমেটোসাস (SLE) এর একটা খারাপ প্রেসেন্টেসন। ডায়গনোসিস নিশ্চিত করার জন্য এবার বাইরের ভালো ল্যাবে CBC, Unrine analysis, ANA, anti-ds DNA করার জন্য পাঠানো হল। দুর্ভাগ্য, এসব রিপোর্ট হাতে আসার আগেই রোগিণী মৃত্যুবরণ করেন।

কাজ করে উপলব্ধি একটাই, প্রায় সবসময়ই আপনি যা ভাববেন এটাই সত্যিকারের ডায়গনোসিস। কিছু রোগীর জন্য আপনি কোন ডায়গনোসিস খুঁজে পাবেন না। এরা দ্বার থেকে দ্বার ঘুরবে, কিছু ভালো হয়ে যাবে, কিছু খারাপ। কিন্তু ডায়গনোসিস (মিস-ডায়গনোসিস বলাই ভালো) করা কিছু রোগীর ভাগ্য খারাপের কারনেই হোক, রোগীর নিজের খামখেয়ালীপনার কারনেই হোক অথবা আমাদের কোন ভুলত্রুটির কারনেই হোক, খারাপ কিছু হবে। হয়তো এরকম রোগী ০.০১% এর ও কম। কিন্তু এরাই মনে ১০০% ছাপ রেখে যাবে।

This is why probably we doctors can’t afford to make any mistake, even have to correct the mistake that was not even there.
Share:

এক নজরে...



ডাঃ লালা সৌরভ দাস

এমবিবিএস, ডিইএম (বারডেম)

ডায়াবেটিস, থাইরয়েড এবং হরমোন বিশেষজ্ঞ (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট)

কনসালটেন্ট, ওয়েসিস হাসপাতাল, সিলেট

প্রাক্তন মেডিকেল অফিসার, সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতাল

মেম্বার অফ বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি

মেম্বার অফ আমেরিকান এ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিকাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট



Subscribe

Recommend on Google

Recent Posts