হারানো বন্ধুর থিয়োরি - কিছু অনুচ্চারিত বন্ধুর স্মরণে

The lost friend’s theory (হারানো বন্ধুর থিয়োরি) এর আরেক নাম হাইজিন হাইপোথিসিস। ছোটবেলা থেকে হাঁচির এলারজির প্রবল সমস্যা থাকায় এলারজির পিছনে কি কি ফ্যাক্টর দায়ী সেটা জানা নিয়ে উৎসুক ছিলাম বরাবরই। হাইজিন হাইপোথিসিস শব্দটা প্রথম জানতে পারি মেডিকেল ড্রামা “হাউস এমডি” দেখতে গিয়ে। শুনতে অনেক কঠিন শুনালেও মানেটা অনেক সোজা। একজন মানুষ বাচ্চাকালে যতবেশী পরিষ্কার থাকবে, তার রোগ হবার সম্ভাবনা ততবেশী। কথাটা শুনতে উলটো শুনায়? কতখানি ঠিক এই তথ্য? 


হারানো বন্ধুর থিয়োরিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জীবাণুগুলো আমাদের হারানো বন্ধু। বিবর্তনের একেবারে শুরু থেকে মানুষ যখন বদলাতে শুরু করলো তখন সে একা বিবর্তিত হতে পারেনি, তার বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে রোগের জীবাণুগুলো। মানবদেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা এই জীবাণুদের দান। এক সদ্যোজাত শিশু যখন বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে আসে তখন তার দেহে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা প্রায় থাকেনা বললেই চলে। স্রষ্টার অশেষ কৃপাতে প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ তাকে পরোক্ষ ভাবে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু এই ছয় মাস জীবনের আরেক বন্ধু হল এই জীবাণুগুলো। জীবাণুগুলো দুর্বল ভেবে বাচ্চাকে আক্রমন করে পরে অবাক হয়ে যায় তার পরোক্ষ ভাবে পাওয়া এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেখে। যুদ্ধে হেরে পরাজয়ের পর পলায়নের সময় সে বাচ্চার নিজের দেহের প্রহরী রোগী প্রতিরোধের ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো কোষগুলোতে রেখে যায় নিজের ছাপ। ঠিক ছয়মাস পর মায়ের বুকের দুধের এই রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতাটা চলে যায়। তারপরেও, বহুদিন পার হয়ে যাবার পরেও যখন রোগের জীবাণু আবার আক্রমন করে দেহকে, চেনা শত্রুকে দেহের শিক্ষিত প্রহরীরা চিনে নেয় এক মুহূর্তেই। এই কারনে ছোটবেলার এসব ছোটখাটো সর্দিজ্বরকে প্রয়োজনীয় ধরে নিয়ে এদেরকে মানুষের বন্ধু বলে ধরে নেয়া হয়। প্রায় একই কথা দাড়ায় ডাস্ট, পোলেন আরও নানা এলারজির জন্য। যারা খুব ছোটবেলাতে গ্রামের ধুলোবালি, পরাগরেনু, পশুপাখির সংস্পর্শে থেকে বড় হয়েছে তাদের বড় হয়ে এসব এলারজির সমস্যা প্রায় থাকেই না বলে দেখা গেছে।
কিন্তু যুগের বিবর্তনে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আমরা এখন দিনদিন এসব রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছি। বাচ্চাকে প্রতিদিন এন্টিসেপ্টিক সাবানে গোসল করানো থেকে শুরু করে ধুলোবালির ছিটেফোঁটাবিহীন ঘরে রাখা, একটু অসুস্থ হলেই এন্টিবায়টিক গুলে খাওয়ানো আর কৌটাজাত দুধ খাওয়ানোর কারনে ছোটবেলায় যেসব রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনায়শে পেয়ে যাওয়ার কথা সেগুলোতে এযুগের বাচ্চারা ঘাটতিতে থেকে বড় হচ্ছে। দেহের প্রহরীরা বড় বেলায় বেয়াড়া স্বভাবের হয়ে যায়, বাইরের রোগের জীবাণুকে এরা তখন চেনার আগ্রহটুকু বোধ করে না। উলটো ঝামেলা বাধায় নিজের দেহের নিরীহ কোষগুলোর সাথে। এই কারনে প্রতিনিয়ত নিজের দেহের বিপরীতে নিজের ইউমিন সিস্টেম দিয়ে হওয়া রোগগুলো বাড়ছে। SLE, Acute Lymphoblastic Leukemia, Arthritis, Type 1 DM, Myasthenia Gravis এসব বিধঘুটে নামের রোগ যা নিজের দেহের অশিক্ষিত প্রহরী কোষ দিয়েই হয়, এসব রোগর নাম এতো ঘনঘন শোনা যাচ্ছে। আমাদের দেশ তাও এসব রোগে অনেক পিছিয়ে। উন্নত দেশগুলো যেখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় বেশী এগিয়ে, সেখানে ক্যান্সারের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর অনেক কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো যদি হয়তো বাচ্চাটা ছোটবেলায় একটু অসুখে ভুগত। হাইজিন হায়পোথিসিস বা লস্ট ফ্রেন্ডস থিয়োরি একে এমন ভাবেই ব্যাখ্যা করে।
আজকে বন্ধু দিবসের সাথে সাথে পহেলা আগস্ট থেকে আগামী সাত আগস্ট পর্যন্ত চলছে World Breast Feeding Week। এই দুইয়ের সঠিক প্রয়োগে হয়তো আগামী প্রজন্মকে কিছু আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এক মনিষী বলেছিলেন, “পৃথিবীতে যদি কোন ধুলাবালি না থাকতো, তবে মানুষ হাজার বছর বাঁচত।” কিন্তু বাস্তবে ধুলাবালি আর রোগজীবাণুর বন্ধুত্বপূর্ণ অবদানটাকেও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।
Share:

কোন মন্তব্য নেই:

এক নজরে...



ডাঃ লালা সৌরভ দাস

এমবিবিএস, ডিইএম (বারডেম)

ডায়াবেটিস, থাইরয়েড এবং হরমোন বিশেষজ্ঞ (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট)

কনসালটেন্ট, ওয়েসিস হাসপাতাল, সিলেট

প্রাক্তন মেডিকেল অফিসার, সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতাল

মেম্বার অফ বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি

মেম্বার অফ আমেরিকান এ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিকাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট



Subscribe

Recommend on Google

Recent Posts