গর্ভকালীন হাইপোথাইরয়েডিজমঃ থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি

থাইরয়েড মানবদেহের জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অন্তঃক্ষরা (হরমোন তৈরি করে এমন) গ্রন্থি। এটি থাইরয়েড হরমোন নামক উপাদান রক্তে নিঃসরণ করে থাকে, যা মানব দেহের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য একান্ত প্রয়োজন। এই হরমোন যখন স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায় তখন যে সমস্যার উদ্ভব হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেটিকে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম।  

এই সমস্যায় ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, এমনকি বৃদ্ধ কমবেশি সবাই আক্রান্ত হতে পারেন। 



স্বাভাবিক মানুষের হাইপোথাইরয়েডিজম এর লক্ষন সমূহঃ


১) শারীরিক দুর্বলতা,

২) ঠাণ্ডা পরিবেশে অস্বস্তি,

৩) পায়খানা কশা হওয়া,

৪) কাজেকর্মে উৎসাহ কমে যাওয়া,

৫) শরীরের ওজন বৃদ্ধি।

৬) মেয়েদের মাসিকের সাথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ইত্যাদি।




তবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মেয়েদের সন্তান ধারনের সময় এই হাইপোথাইরয়েডিজম সমস্যাটির ঝুকি। এই সময়ে উপরের লক্ষন প্রকাশ না পেয়েও মায়েরা হাইপোথাইরয়েডিজমের ঝুকিতে ভুগতে পারেন। আর এই হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে মেয়েদের গর্ভধারনের সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গর্ভপাত ঝুকি অনেকগুন বেড়ে যায়। এমনকি হাইপোথাইরয়েডিজম অজানা থাকলে তা মেয়েদের গর্ভধারনেও বাঁধার সৃষ্টি করে থাকে। এটা জেনে রাখা প্রয়োজন যে গর্ভকালীন সময়ে খুব সামান্য থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিই মায়ের অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত, বাচ্চার বুদ্ধির বিকাশের সমস্যা সহ নানাবিধি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই সামান্য থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি সঠিক ভাবে নির্ধারণ এবং গর্ভকালীন সময়ে অথবা গর্ভধারনের আগে সঠিক এবং দ্রুত চিকিৎসা করে নিরাপদ গর্ভধারণ করা একান্ত জরুরী। 





গর্ভকালীন হাইপোথাইরয়েডিম বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনাঃ



১) পরিবারে কারো থাইরয়েডের সমস্যা অথবা থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি জনিত  রোগের লক্ষনসমূহ কারো থাকলে তিনি গর্ভধারনের আগেই হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

২) যাঁদের হাইপোথাইরয়েডিজম সমস্যা টি আছে তাঁদের সবাইকে ডাক্তারের পরামর্শে পরিকল্পিত ভাবে গর্ভধারণ করতে হবে। নতুবা গর্ভপাতের ঝুকি অনেক বেড়ে যাবে। এধরনের রোগীর থাইরয়েড হরমোনের ট্যাবলেট নিয়মিত ভাবে গ্রহন করে বাচ্চা নিতে হবে এবং গর্ভধারন নিশ্চিত হওয়া মাত্র ওষুধের মাত্রা -২৫-৩০% বৃদ্ধি করে নিতে হবে।


৩) যাঁদের হাইপোথাইরয়েডিজম সমস্যাটি নেই এমন মায়েদের ক্ষেত্রেও প্রতিটি প্রেগ্ননেন্সির প্রথম তিন মাসের রুটিন চেক আপের সাথে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে থাইরয়েড হরমোনের পরীক্ষা (S. TSH) পরীক্ষাটি করতে হবে। পরীক্ষায় S. TSH: 4.0 mU/L এর বেশি আসলে হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অন্য পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে, নতুবা গর্ভপাতের ঝুকি অনেকগুণ বেড়ে যাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, স্বাভাবিক রোগীর নরমাল S. TSH এর মাত্রা গর্ভকালীন সময়ে প্রযোজ্য হবে না। তাই  সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় ও তার সমাধানে এই বিশেষক্ষেত্রে হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কোন বিকল্প নেই।



৪) যেসব মেয়েদের বারবার গর্ভকালীন সময়ে গর্ভপাত হচ্ছে তাঁদেরকেও থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি আছে কিনা তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। 

৫) যেসব মায়েদের গর্ভকালীন সময়ে হাইপোথাইরয়েডের সমস্যাটি নতুন করে ধরা পড়েছে, তাঁদের বাচ্চা হবার ৬ সপ্তাহ পরে আবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে সমস্যাটির সাময়িকভাবে নাকি সারাজীবন চিকিৎসা প্রয়োজন হবে।



সবশেষে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে থাইরয়েড হরমোনজনিত মাতৃত্বকালীন সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নিই। তাই আমরা সবাই এই সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করি এবং এটি সম্পর্কে সচেতন হই।
Share:

কোন মন্তব্য নেই:

এক নজরে...



ডাঃ লালা সৌরভ দাস

এমবিবিএস, ডিইএম (বারডেম)

ডায়াবেটিস, থাইরয়েড এবং হরমোন বিশেষজ্ঞ (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট)

কনসালটেন্ট, ওয়েসিস হাসপাতাল, সিলেট

প্রাক্তন মেডিকেল অফিসার, সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতাল

মেম্বার অফ বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি

মেম্বার অফ আমেরিকান এ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিকাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট



Subscribe

Recommend on Google

Recent Posts