২৯ জুলাই, ২০১৪

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

প্রায় তিন দশক আগের কথা, ২৬ জুলাই ১৯৮২। ৩১ বছর বয়সী তরুন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটিতে একটি শুটিং স্পটে একশন দৃশ্যে অভিনয় করছেন মনমোহন দেশাই-এর বিখ্যাত “কুলি” ছবির জন্য। সে জামানায় একশন দৃশ্যের জন্য স্টান্টম্যানের ব্যবহার এতো বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেনি, অভিনেতারা নিজেরাই চালিয়ে যেতেন বিপদজনক এই কাজ। একটি একশন দৃশ্যে অভিনয়কালে সঠিক সময়ের আগেভাগেই জাম্প দিয়ে গুরুতর আহত হলেন তিনি। গুরুতর আহত নায়ককে ব্যাঙ্গালোরে প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত নিয়ে আসা হল মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হসপিটালে। ডাক্তার জানালেন পেটের ভিতরে প্রচুর অভ্যন্তরীণ রক্তপাত হয়ে রোগীর অবস্থা আশংকাজনক, দ্রুত কয়েক ব্যাগ রক্ত লাগবে। তড়িঘড়ি করেই রক্ত জোগাড় করা হল, রক্ত জোগাড় করে অপারেশন থিয়েটারে দ্রুত ইমারজেন্সি স্প্লিনেকটমি করা হল এই মহানায়কের। এরপর দিন গেলো, স্রষ্টার কৃপায় ধীরে ধীরে অল্পঅল্প করে সুস্থ হতে থাকলেন তিনি। এরপর বহুবছর কেটে গেলো। আগের ঘটনার পর থেকে নায়ক স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে প্রায়ই রুটিন চেক-আপ করতে যেতেন ডাক্তারের কাছে। ৮ বছর পর লিভারের কিছু এবনরমাল টেস্ট রেজাল্ট দেখে ডাক্তারের সন্দেহ হল। আরও বিস্তারিত পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়লো নায়কের লিভার সিরোসিস (বাংলায় বলতে গেলে, যকৃতের প্রায় চিরস্থায়ী একটা রোগ যার কারনে যকৃতের ক্ষমতা ক্রমাগত কমে গিয়ে পুষ্টি উপাদানগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং যা পরবর্তীতে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে)। নায়ক অবাক হলেন, লিভার সিরোসিস রোগ এলকোহলিকদের মাঝে বেশী। তিনি তাঁর জীবনে মদ্যপানের স্বভাবটাকে ঘৃণা করে কঠিনভাবে একে সর্বদা বর্জন করে গেছেন। তবে কেন তাঁর এই রোগ? পরে দেখা গেলো তাঁর লিভার সিরোসিস এর কারন ভাইরাল হেপাটাইটিস। কবে কি ভাবে এই ভাইরাসের শিকার হলেন তিনি? এরও উত্তর পাওয়া গেলো, সেই মেসিভ ব্লাড ট্রান্সফিউসনের হিস্ট্রি থেকে। তখনকার দিনে হেপাটাইটিসের জন্য রক্তদানের আগে এন্টিজেন টেস্টগুলো ছিল অপ্রতুল, আর এতো অল্পসময়ে এতো বিশাল পরিমানের রক্ত লেগেছিল নায়কের যে হয়তো কোন রক্তের ব্যাগ বাদ পড়ে যায় পর্যাপ্ত পরীক্ষা থেকে। এখনো নায়ককে লিভার সিরোসিসের জন্য প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিয়ে যেতে হচ্ছে...





পুরো ঘটনাটা গল্পের মতো, বাস্তবে হরহামেশা এই গল্প নতুন করে লিপিবদ্ধ হচ্ছে। হেপাটাইটিস এখন মেডিসিনের এক অন্যতম রোগ। কিছু হেপাটাইটিস খুবই সাধারণ। বাইরে হয়তো খেতে গিয়ে ওয়েটারের দেয়া অপরিষ্কার পানির গ্লাস থেকেই হয়তো আক্রান্ত হবেন আপনি। দুর্বল আর হলুদবর্ণ ধারণ করে একমাস ঘরের ভিতর শুয়ে বসে থেকে বাংলাদেশের প্রন্থা অনুযায়ী তেলমশলা কম দেয়া বিস্বাদের খাবার খেয়ে ঠিকই ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু বিপদজনক প্রজাতির হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো রক্তের আদানপ্রদান, শারীরিক সম্পর্ক অথবা ড্রাগ নিডেলের মাধ্যমে আপনার দেহকে আক্রান্ত করে হয়তো বুঝতেই দিবে না যে আপনি অসুস্থ। নীরবে বাসা বানিয়ে আপনার দেহকে শেষ করে ঠিক শেষ মুহূর্তে জানান দিবে এই যে আমি তোমার চিরসঙ্গী ছিলাম চুপিচুপি।

স্কুলে যাবার পর থেকেই বাইরের খাবারের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ মেটাতে লুকিয়েচুরিয়ে বাইরে খাওয়া, হয়তো সেই খাওয়া থেকে জন্ডিস। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল, পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তার সাহেব জানালেন এক মাসের বিশ্রাম নিতে, এটাই নাকি চিকিৎসা। তখন ক্লাস ৬/৭ এ পড়ি। একমাসের বিশ্রাম মানে একমাসের স্কুল ছুটি। আমাকে আর কে পায়! অনেক বড় রোগীর মতো মুখ ভার করে বিছানায় শুয়ে থাকি, আত্মীয়স্বজনরা এসে দেখে যান। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে বেশ কিছু গল্পের বইও জোগাড় করে ফেললাম, সময়টা ভালোই কাটল। শুধু যন্ত্রণার ছিল খাওয়াদাওয়াটা, মুখের স্বাদটাতো নাই বললেই চলে, তার উপর আমার জন্য রান্নাতে তেলমশলার চরম ঘাটতি। এরমাঝে কে জানি পরামর্শ দিলে আয়ুর্বেদিক কোন ঔষধে নাকি জন্ডিসটা তাড়াতাড়ি কমে যায়। এক বোতল সেই ঔষধটাও জোগাড় করা হল, ঔষধের রঙটা দেখে আমার চীৎকারে অতঃপর আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সেইখানেই সমাপ্তি। ইতিমধ্যে আমার এক মামাতো বোন আমাদের পরিবার থেকে প্রথম ডাক্তারনী হয়ে বের হয়েছে। সে মা বাবাকে বুদ্ধি দিল, কোত্থেকে কোন ভ্যাক্সিনেশন করালে নাকি এই রোগের আরও খারাপ জাতভাই থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আমিও প্রথম প্রথম অনেক আগ্রহ নিয়ে গেলাম ভ্যাক্সিনেশন করাতে, প্রথমবার সূইের খোঁচাতেই আগ্রহ মিটে গেলো। তারপরও ডাক্তারবোনের জোরাজোরিতে পুরো ডোসটা শেষ করতে বাধ্য হতে হয়। এখনো মেডিকেলে অনেককেই দেখি ডাক্তার হয়ে গেছে, কিন্তু হেপাটাইটিসের ভ্যাক্সিনেশনটা করা নেই। তখন মামাতো বোনের ডাক্তারির কথাটা মনে চলে আসে।

এখন সরকার ছোট বাচ্চাদের ভ্যাক্সিনেশনে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিনটাকে যোগ করে দিয়েছে বিনামূল্যে। কিন্তু আমার ফ্রেন্ডলিস্টের প্রায় সবাই নব্বইের দশকের অথবা তারও আগের, তখন এই ভ্যাক্সিন সরকারের বিনামূল্যে প্রদানকারী ভ্যাক্সিনগুলোর তালিকায় ছিল না। তাই এমন মানুষ হয়তো কম হবে না যাদের এখনো ভ্যাক্সিন নেয়া হয়নি। ভ্যাক্সিন নিতে হয়তো কিছু টাকা বের হয়ে যাবে পকেট থেকে, তারপরও সামান্য সতর্কতাই অনেক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিবে আপনাকে। হেপা-এ এবং হেপা-বি এই দুই ভাইরাসের প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন আছে, সব থেকে খারাপ হেপা-সির প্রতিরোধে এখনো কোন ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই নিকটআত্মীয়র বাইরে কারো থেকে রক্তগ্রহনে বিশেষ সতর্কতা নিন, ধর্মীয় অনুশাসনের কোন বিকল্প নেই। এমনকি সেলুনে চুল কাটতে অথবা সেভ করতে গেলে নতুন ব্লেড কেনার টাকা দরকার হলে নিজের পকেট থেকে দিয়ে হলেও পূর্বব্যবহৃত ব্লেড বদলাতে বাধ্য করুন। ডাক্তার যারা আছেন, তাঁদের কাছে মামার বাড়ির গল্প গাইবো না। হেপাটাইটিস অথবা এইচআইভিযুক্ত হাইলি ডেঞ্জারাস ইনফেক্সাস রোগীকে কিভাবে ডিল করতে হয় এটা না জেনে কেউ পাস করে না। যদি মিস হয়ে যায় অথবা ভুলে গিয়ে থাকেন তো আরেকবার স্মরণ করে নিবেন।

যারা সন্ধানী/মেডিসিন ক্লাব/রক্তদান কর্মসূচীর সাথে জড়িত, তাদের সবথেকে বড় ভূমিকা হতে পারে মানুষকে একটুখানি সচেতন করে তোলায়। একটা ব্যবহারকৃত নিডলের মাঝে এইডস এর জীবাণু এইচআইভি আর হেপাটাইটিস দুটো জীবাণু থাকলে সেই নিডেল দিয়ে যদি প্রিক খান তবে আপনার এইডস হওয়ার যতটা না চান্স থাকবে তার থেকে প্রায় ১০০গুন বেশী চান্স থাকবে হেপাটাইটিস দিয়ে আক্রান্ত হবার। নিজের গরজে একটু স্যারদের জিজ্ঞেশ করে হলেও জেনে নিন, হেপাটাইটিস বি এর সংক্রামণে কি করবেন, হেপাটাইটিস সি এর সংক্রামণে কি করবেন। নিজে জেনে নিলে হয়তো নিজের সাথে অন্যদের জানার ঘাটতিটাও পূরণ করে দিতে পারবেন।

এতোকিছু বলার কারন আজকে “বিশ্ব যকৃত প্রদাহ দিবস”। নাহ, “বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস” এই বাংলিশটাই ভালো শোনায়। ঈদের খাবার খেতে গিয়ে পরিষ্কার পরিছন্নতায় এবার তাই হয়তো একটু বেশিই খেয়াল রাখবেন। সবাইকে আবারো ঈদের শুভেচ্ছা রইলো।।