৩১ মে, ২০১৪

বিশ্ব তামাকবিরোধী দিবস ২০১৪

ছোটবেলায় লাল, নীল নানাবর্ণের সিগারেট লাইটার জমাতে খুব ভালো লাগতো। আমার এক দাদু, যিনি অনেকটা চেইন স্মোকার ছিলেন, তাঁর কল্যাণে আমার এই লাইটারের কালেকশন বেশ ভালই ছিল। কিভাবে একটা স্পার্ক থেকে আগুণ জ্বলে উঠে এই অদ্ভুত জিনিসটা আমাকে সবসময়ই আকর্ষণ করতো। কিন্তু বলাই বাহুল্য, যতবার আমার এই কালেকশন মায়ের হাতের কাছে পড়তো ততবারই লাইটারগুলোর জায়গা হতো রাস্তার পাশের ড্রেইনে। মায়ের মনে একটা অদ্ভুত ধারনা ছিল, যে ছেলের হাতে ছোট বয়সে লাইটার পড়লে সে বড় হলে সিগারেট খাওয়া শুরু করে দিবে। বারবার প্রতিবাদ করতাম, করে আবার জমানো শুরু করতাম চুপিচুপি করে। কিন্তু কে শুনত কার কথা। প্রতিবারই লাইটারগুলো হারিয়ে যেত মায়ের হাতের ছোঁওয়ায়। একসময় বিরক্ত হয়েই হার স্বীকার করলাম। এরপর স্কুলজীবনের মাঝামাঝি সময়ে এসে একদল বন্ধুকে দেখলাম, ক্লাসব্রেকের সময়ে কোথায় জানি হারিয়ে যেতে। একসময় খুঁজেপেতে আবিষ্কার করলাম কি হয় এই সময়ে। স্মোকারদের খুব ভালো স্বভাব হচ্ছে এরা অনেক শেয়ারিং মাইন্ডেড, কিন্তু মনের খচখচানিতে কখনো এই শেয়ারের ভাগীদার হওয়ার ইচ্ছে জাগেনি, হয়তো ছোটবেলার লাইটারের শিক্ষে। স্কুল জীবনে শুরু হয় ফ্রেন্ডের শেয়ারিং থেকে, কলেজে জীবনে সেই মেয়েটাকে ইম্প্রেস করতে গিয়ে আর মেডিকেল লাইফে ফ্রাসট্রেসন কাটাতে গিয়ে। মেডিসিন ওয়ার্ডে প্রতি এডমিসনে গড়ে ১টা করে শ্বাসকষ্ট, বুক ব্যাথার পেসেন্ট পেতাম যাদের ফাইনাল ডায়গনসিস হতো ফুসফুসের ক্যান্সার। হিস্ট্রি নিতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখতাম, মেয়েরাও বিড়ি সিগারেট খেতে কম যায় না। নিজের ডিসিশন অন্যের উপর দিয়ে চালিয়ে দেয়ার বদ একটা স্বভাব আছে আমার, এক স্বভাব নিয়ে মাঝে তখনই শুধু ভালো লাগে যখন রিকশাওয়ালাকে চাপ দিয়ে রিকশা চড়া অবস্থায় অন্তত সিগারেট খাওয়াটা বাদ দেয়াতে পারি। দুদিন আগেই, সামনে বাজেটে সিগারেটের উপর ট্যাক্স বাড়ানোর জন্য খোলা একটা ফেসবুকে ইভেন্টে আমাদের জুনিয়র একটা মেয়ের পোস্ট দেয়ার পর তাঁর পোস্টের প্রতিবাদে কমেন্ট দেখে বুঝতে পারলাম, রিকশাওয়ালারাও অনেক কিছু বুঝে যা আমাদের মাঝে অনেকেই বুঝে না।



শেষ করার আগে আরেকটা গল্প। গল্পটা আমাদের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের প্রফেসর ডাঃ মান্নান স্যারের, ওয়ার্ডে তাঁর মুখে শোনা। ওয়ার্ড রাউন্ড দিতে দিতে হটাত এক্সিডেন্টাল লাইম (চুন) পয়সনিং এর বাচ্চাকে দেখে স্যারের মুখে তাঁর মায়ের আর বউের কথা আসলো। স্যারের মা অনেকটা সৌখিন স্বভাবের, মেডিকেলের ব্যস্ততার জীবনের মাঝে স্যার যতবার বাড়িতে যেতেন, ভরপেট খাওয়ার পর স্যারের মা বিরাট একটা পানের বাটা নিয়ে ছেলের পাশে বসতেন, বসে নানান মশলা, চুন, জর্দা মেশানো এক খিলি পান স্যারকে খাওয়ানোর পর দুজনের গল্প হতো। একসময় স্যারের বয়স বাড়লো, স্যার মায়ের পছন্দে বিয়েও করলেন। বিয়ের পরদিন রাতে খাবার পর স্যারের মা যথারীতি স্যারের জন্য পান বানাতে বসলেন, তখন স্যারের বউ এসে স্যারের মায়ের কাছ থেকে পানের বাটা নিয়ে গিয়ে বললেন, "মা, আমার জামাইকে আমি আর পান খাওয়াতে দিবনা।" এটা প্রায় ৩০ বছর আগের কথা, এরপর থেকে স্যারের আর পান খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি! বাই দি ওয়ে, এতো কথা বলার পর স্যার শুধু বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়েই ডায়গনসিস করলেন যে চুনটা শুধু বাচ্চাটার মুখের কিছু লোকাল ইঞ্জুরি করেছে, পেটের ভিতর যায়নি। স্যারের ভাষায়, ৩০ বছর আগে আমার মুখের ভিতরটা দেখলে তোমরা বুঝতে পারতা যে, পান চুন কতো ভয়ঙ্কর।
আজ বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস, একটা দিন ভালো লাগার মানুষটার কথা শুনুন, একটা দিন থেকে বদলে যেতে পারে সব কয়টা দিন।
বাদবাকি যারা সিগারেট খান না, চুনপান কিছুই খান না: অনেকসময় আমরা কাছের মানুষের অনেক কিছু দেখেও এড়িয়ে যাই। বাইরের মানুষকে বুঝানোর আগে নিজের কাছের মানুষকেই বুঝানো সবার আগে দরকার। আমি ও মাঝে মাঝে চেষ্টায় থাকি, কতোটুকু কাজে আসে জানিনা, তবুও লেগে থাকি। হয়তো কোন সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়...