০১ জুলাই, ২০১৪

ডায়গনোসিস

কোন এক মঙ্গলবার, জানুয়ারি মাস চলছে তখন। মাস খানেক হয়েছে ইন্টার্ন হিসাবে মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্টের। ফিমেইল এডমিশন টেবিলে বসে আছি। এডমিশন চলছে, পেসেন্টের অপেক্ষা। সকালবেলার একটা সময়ে পেসেন্ট আসার একটা রাশ আওয়ার থাকে, হুড়মুড় করে পেসেন্ট আসতে থাকে। ঐ দিন সময়টা বেশ নিরবেই কাটছিল। হটাত এক রোগিণীর আগমন। মধ্যবয়স্ক মহিলা, সাথে মেয়ের বয়সী আরেকজন। এক্সামিনেসন টেবিলে শুতে বলে রোগীর হিস্ট্রি নিতে গেলাম। মহিলা নিজে কোন কথাই বলতে চান না, সাথের জন আবার কথা বলা শুরু করলে থামতেই চায় না। ধমক দিয়ে মহিলাকে নিজের সমস্যা নিজেই বলতে বললাম, তার ভাষ্য অনুযায়ী সপ্তাহখানিক আগে জ্বর আর হাতের জোড়ায় ব্যথার কারনে গ্রামের এক ডাক্তারকে দেখান তিনি। ডাক্তার দেখে কিছু ওষুধ দেয়ার পর সেটা খাবার পর জ্বর কমে গেছে, কিন্তু মুখে আর হাতের উপর গুটিগুটি কতোগুলো আর মুখের ভিতরে ঘা। “ফিভার উইথ র‍্যাশ” আর “এডভারস ড্রাগ রিএকশন” দুটোকে মাথায় রেখে আরও কিছু প্রশ্ন করলাম, মহিলা কোন উত্তর সোজা ভাবে দিতে চায় না। মুখ দিয়ে কখনো রক্ত গেছে কিনা, কখনো পক্স হয়েছে কিনা আর কোন সমস্যা আছে কিনা এসব প্রশ্নের জবাবে একবার হাঁ বলে, আরেকবার না বলে। হিস্ট্রি শেষ করে ক্লিনিকাল এক্সামিনেসন করতে গিয়ে বিপি মাপতে গিয়ে দেখি প্রেসার ৬০/৪০। নার্সকে দ্রুত আইভি কেনুলা করতে বলে সাথের পুরুষ এটেনড্যান্সকে পাঠালাম আনুশাঙ্গিক জিনিসপত্র আনতে। কথা বলে জানতে পারলাম প্রায় ২ দিন ধরে তার কিছু খেতে ভালো লাগে না, এই কারনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। এদিকে সিস্টার দ্বিধাবোধ করছে, গুটিগুটি দাগ গুলো কিসের না কি, সংক্রামক না আবার। ভাল করে তাকালাম এতক্ষনে মহিলার চেহারার দিকে, দাগগুলোকে টিপিকাল চিকেনপক্সের দাগ বলা যাবে না, কি ডেসক্রিপসন হতে পারে নিজেই বুঝতে পারছি না, একটু পর এসেই স্যার জিজ্ঞেশ করবেন ডেসক্রাইব ইওর কেইস। ম্যাকুলো-প্যাপুলার লেইসন বলেই ডেসক্রাইব করব ভাবলাম, তারপর মুখের ভিতরে ঘা আর জ্বরের জন্য প্রবাব্লি এন্টিবায়োটিক ইনটেকের হিস্ট্রি আছে বলে স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোমেই নিয়ে যাবার কথা চিন্তা করলাম। যেইখানেতে বাঘের ভয়, সেইখানেতেই সন্ধ্যা হয়। বলতে না বলতেই স্যার এসে হাজির। তাও একজন স্যার না, তিন তিন জন স্যার। অগোছালো ভাবে হিস্ট্রি প্রেস্নেন্ট করলাম, নিজের ডায়গনোসিস ও বললাম। স্যাররাও দেখলাম দাগটাকে নিয়ে একটু কনফিউসড। জ্বর আগে না দাগ আগে এই প্রশ্নের উত্তর মহিলা ঠিক ভাবে দিতে পারে না, আবার তার নাকি আগে থেকেই জোড়ায় ব্যথা মাঝেমাঝেই থাকে। এক স্যার হটাত জানতে চাইলেন, এখানে আসলেন কেন? তখন হটাত মহিলা বলে, গতকাল এক ডাক্তার দেখাইসি উনিই প্রেসক্রিপশনে লিখলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগবে। আমি মাঝ থেকে বজ্রাহত, এতক্ষন পর এই কথা বলতেসে মহিলা! সাথের বেশী কথা বলা মহিলাটা এতক্ষনে এনে সেই প্রেসক্রিপসন স্যারের কাছে দিল, উঁকিঝুঁকি মেরে দেখালাম আমাদের মেডিকেলেরই স্কিনভিডির বড় এক স্যার, স্যারের ডায়গনোসিসও স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোম। দেখে নিজের মাঝে একটা আত্মতৃপ্তির বোধ আসলো, যাক চিন্তা ভাবনার লাইনতো ঠিক আছে। স্যাররাও এডভারস ড্রাগ রিএকশন হিসাবে পেসেন্টকে ট্রিট করার সায় দিলেন। রোগিণীর চিকিৎসা হল, সকল এন্টিবায়োটিক বাদ দিয়ে জ্বরের জন্য নাপা সাপোসিটোরি, ফেক্সোফেনাডিন ১৮০গ্রাম, অরাল স্টেরয়েড (স্কিনের স্যারের পরামর্শে), রেনিটিডিন এবং প্রয়োজনে পারএন্টারাল নিউট্রেসন। পরদিন অন্যান্য রোগীদের মতো রোগিণীর রুটিন ইনভেসটিগেসনগুলো (CBC, Urine analysis, Serum Creatinine, RBS etc) হাসপাতালের ল্যাবে পাঠানো হল। রাতে রাউন্ডে গিয়ে যথারীতি প্রায় একই রকম রিপোর্ট দেখলাম সিবিসি নরমাল, ইএসআর একটু বেশী, ইউরিনে কিছু পাস সেল, নো প্রোটিন, নো কাস্ট এরকম রিপোর্ট, সরকারী হাসপাতালের রিপোর্ট যেমন হয়। এদিকে রোগীর লোক আমাদের কথায় গ্রামের ডাক্তার কি ওষুধ দিয়েছিল সেটা এসএমএস করে জোগাড় করেছে। এডভারস ড্রাগ রিএকশন করতে পারে এমন এন্টিবায়োটিক থাকায় আমরা আর ডায়গনোসিস পাল্টানোর কথা ভাবলাম না। ৪/৫ দিন গেলো, রোগীনির কিছুটা ভালো লাগছে। একেতো শীতের সময়, তার উপর হাসপাতালে কেউ থাকতে চায় না। রাউন্ড বা ফলোআপে রোগিণীর পাশে গেলেই তার এক কথা, ওষুধ লিখে ছুটি দিয়ে দিতে। পরে স্যার এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন যেতে চাইলে DOR (ডিসচার্জ অন রিকুয়েস্ট) লিখে ছুটি দিতে। রোগিণী খুশি মনে চলে গেলো, আমরাও ভুলে গেলাম ব্যাপারটা।



সপ্তাহ দুয়েক পর নন-এডমিশন দিনে এডমিশন টেবিলে বসে আছি। রোগিণী আবার হাজির, হাতে ছুটির কাগজটা। তার সিম্পটম আবার দেখা দিয়েছে, কোন কোন ওষুধ আবার খেতে হবে জানতে এসেছে। রোগীর অবস্থা দেখে রোগীকে আবার ভর্তি হতে বললাম, না সে ভর্তি হবে না। ভর্তির বাইরে আমরা কোন রোগীকে কিছু প্রেসক্রাইব করতে পারিনা বলে বহির্বিভাগে আরপির সাথে যোগাযোগ করতে বললাম। ভাবছিলাম আরপি হয়তো তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানাতে পারবে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেই গিয়ে যে সে কই হারিয়ে গেলো আর দেখা গেলো না।
এরও আরও কিছুদিন পর। রোগিণী আবার ভর্তি হল, অন্য একটা মেডিসিন ইউনিটে। এবার সাথে নতুন সিম্পটম, দুদিন ধরে প্রস্রাব প্রায় হয়ই না, রোগিণীর খুব অবস্থা খারাপ। জোড়ায় ব্যথা, মুখে ঘা আর কিডনির সমস্যা সবকিছুকে এক সাথে ফেলে নিগেটিভ সিম্পটমগুলোকে বাদ দিলে একটাই ডায়গনোসিস আসে, লুপাস নেফ্রাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস এরাইথোমেটোসাস (SLE) এর একটা খারাপ প্রেসেন্টেসন। ডায়গনোসিস নিশ্চিত করার জন্য এবার বাইরের ভালো ল্যাবে CBC, Unrine analysis, ANA, anti-ds DNA করার জন্য পাঠানো হল। দুর্ভাগ্য, এসব রিপোর্ট হাতে আসার আগেই রোগিণী মৃত্যুবরণ করেন।

কাজ করে উপলব্ধি একটাই, প্রায় সবসময়ই আপনি যা ভাববেন এটাই সত্যিকারের ডায়গনোসিস। কিছু রোগীর জন্য আপনি কোন ডায়গনোসিস খুঁজে পাবেন না। এরা দ্বার থেকে দ্বার ঘুরবে, কিছু ভালো হয়ে যাবে, কিছু খারাপ। কিন্তু ডায়গনোসিস (মিস-ডায়গনোসিস বলাই ভালো) করা কিছু রোগীর ভাগ্য খারাপের কারনেই হোক, রোগীর নিজের খামখেয়ালীপনার কারনেই হোক অথবা আমাদের কোন ভুলত্রুটির কারনেই হোক, খারাপ কিছু হবে। হয়তো এরকম রোগী ০.০১% এর ও কম। কিন্তু এরাই মনে ১০০% ছাপ রেখে যাবে।

This is why probably we doctors can’t afford to make any mistake, even have to correct the mistake that was not even there.

২৯ জুন, ২০১৪

রমজান ২০১৪



বছরের প্রতিটি সময়ের পিছনে টুকরো কিছু গল্প থাকে। বছর ঘুরে ঐ সময়টা আসলেই সেই গল্পগুলো মনটা দখল করে নিতে চায় জোর করেই। কারো জন্মের মাস ক্যালেন্ডারের পাতায় ভেসে উঠলেই, সে যতই গুরুগম্ভীর মানুষ হউক না কেন ছোটবেলার কথা আবছা ভাবে চলে আসে মনে। রমজান মাসটাই তার কিবা ব্যতিক্রম। 
 


স্কুল বা কলেজ লাইফে রমজান মাসকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার মতো সুযোগ কখনো হয়ে উঠেনি। মাঝেমাঝে বন্ধুদের ইফতার পার্টির দাওয়াত পেতাম, বাস্তব জীবনে চরম অসামাজিক থাকায় প্রায় সব সময়ই অনুপস্থিত থাকা হতো অনুষ্ঠানগুলোতে। এরপর মেডিকেল জীবন, ভর্তির প্রথম বছরে আমাদের আবাসন হিসাবে তখন হোস্টেলের সিট ছেলেদের প্রায় সবার কপালে হয়ে উঠেনি। কলেজ গেটের ওপাশে “সেবা” নামের পাচতালা বিল্ডিংটা ছিল আমাদের এক বছরের আবাসস্থল। ছোটছোট খুপরির মতো রুম, দুজন করে একসাথে থাকা। রমজান মাস আসার আগেই বাসা থেকে সবাই চিন্তিত, খাওয়া দাওয়ার কি হবে। আমাদের খাবার দিয়ে যায় যে খালা উনি আশ্বস্ত করলেন, “মামা, খাওয়াদাওয়ায় কুনু সমস্যা হইব না, আমরা দুপুরে আগের মতোই খাবার দিয়া যামু”। যাই হোক রমজান শুরু হল যথারীতি, নতুন পরিচয় হওয়া কাঁচা বন্ধুদেরকে দেখে খারাপই লাগতো। ক্লাস আর নানান ঝক্কিঝামেলার মাঝে রোজা রাখা এতো বেশ কষ্টের কাজ। চাইতাম, নিজের খাওয়াদাওয়ার কাজটা যতটা পারি ওদের চোখের আড়ালে রাখার। তখন রাতে ঘুমাতাম বেশ সকাল, ঘুম ভাঙ্গত অনেক ভোরে, প্রায়ই রোজাদার বন্ধুদের জাগিয়ে দেয়ার দায়িত্বটা পালন করতাম। এবার অনেকগুলো ইফতার পার্টি চাইলেও পাশ কাটিয়ে যেতে পারিনি বন্ধুদের চাপাচাপিতে।

২য় বর্ষের রমজানটা স্মৃতিতে অনেকটা আবাছা। প্রথম প্রফ পরীক্ষার একেবারেই শেষের দিকে শুরু হওয়া রমজানের কারনে ম্যাক্সিমাম রোজাই বাসায় কাটানো হয়েছে। ততদিনে আমাদের জন্য হোস্টেলের চকচকে নতুন রুম বরাদ্দ হয়েছে। ভাইভার ব্যস্ততায় যে দুই একটা রোজা হোস্টেলে পেলাম, পুরাতন ফ্রেন্ড আর নতুন করে হওয়া রুমমেটদের সাথে একসাথেই।

তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম বর্ষের প্রতিটা রোজার দৃশ্য একই রকম। আর যাই হউক, বন্ধুদের ফেলে খাওয়া যায় না, হোস্টেল লাইফে এটাই শিখলাম। ভোররাতে একজন আরেকজনকে ডেকে ঘুম থেকে জাগানো, একসাথে মিলে ফ্লোরে বসে ইফতার বানানো, অদ্ভুত সব খাবার আইটেম এনে ইফাতারের সময় টেস্ট করা, ড্রিকন্সের বোতল নিয়ে কাড়াকাড়ি করা, কার আনা কোন আইটেম সব থেকে জঘন্য এটা নিয়ে এক জন আরেকজনকে পচানো, কোনদিন দল বেধে ৭ জন মিলে একসাথে প্ল্যান করে বাইরে ইফতার করতে যাওয়া এসব প্রতি বছরের দৃশ্য। দেখতে দেখতে কেউ এক্সপার্ট হয়ে গেলো ট্যাং-এর প্যাক পানি গুলে ড্রিঙ্কস বানাতে, কেউ লেবুর শরবত বানাতে, কেউ কাঁচামরিচ আর পেয়াজ কাটাকাটিতে। শাকভর্তা, হালিম, খিচুড়ি, মিষ্টি, বার্গার, চপ, দই, কুমিল্লার কোন লতাপাতা বাকি ছিলনা আমাদের খাওয়াদাওয়ার মেন্যু থেকে। কখনো ইফতার নিয়ে একজনের সাথে আরেকজনের মনমালিন্য, তো আরেকজন গিয়ে মধ্যস্ততা করে সেটা মিটিয়ে আসা। কখনো কে আজকে ইফতার কিনতে যাবে এটা নিয়ে রাগবিরাগের খেলা। কিন্তু দিনের শেষে আমরা কজন, একসাথে। কখনো হিন্দু মুসলিম এই বিভেদে পড়তে হয়নি, এমনকি আমি কি খাই না খাই এটা ভেবেও ওরা ইফতার বাজার করতে যেত। বাইরের সবাইকেই এই বন্ধুত্বটা বুঝানো খানিকটা কষ্টের ছিল, কিন্তু এই কষ্টটার মাঝেও স্বস্তির কিছু ছিল গত বছরগুলো ধরে।

গতবছর ইন্টার্নী লাইফে ঢুকে সবাই অনেক ব্যস্ত, কিছু বন্ধুর তখন প্রফ ক্লিয়ার হয়নি। তারপরেও তখন বিদায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেনি রমজান মাসে। যতটুকু সম্ভব কাছাকাছিই ছিলাম সবাই সবার। এই বছরটাই প্রথম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলো বিদায় ধ্বনি।
কাছে হোক বা দূরে হোক, একজনের স্মৃতিতে আরেকজন আছি, সান্ত্বনা এটাই। সবাইকে রজমানের শুভেচ্ছা রইল।

২৭ জুন, ২০১৪

প্রফেসনাল এক্সামঃ নতুনে করে পুরনো দিনের কথা

প্রথম প্রফঃ ২০০৯ এর জুলাই মাস, হোস্টেলে থমথমে অবস্থা। কয়েকদিন হল সরকার বদলের। সবার মাঝে চাপা অস্থিরতা। তখন ২১১ নম্বর রুমের বাসিন্দা। পাঁচ রুমমেট আমরা, একেকজন একেক প্রজাতির। তিনজন জানপ্রান দিয়ে পড়ছে। আমি আর হিমেল দুইজন একেতো ফাকিবাজ, তার উপর মনমেজাজ খারাপ, হয় মোবাইলে টিপাটিপি করে বেড়াই, না হয় গল্পবইের দুনিয়াতে ব্যস্ত। সত্যিকথা বলতে ফাস্ট প্রফের আগে যত তিনগোয়েন্দা আর মাসুদরানা পড়া হল, ৫ বছরের মেডিকেলে তার অর্ধেকও পড়া হয়ে উঠেনি। বেশী মানুষ এক সাথে বেশীক্ষণ থাকলে ঝামেলা বাড়ে, প্রফের আগেতো মেজাজ এমনিতেই সবার চড়া, অনেক ঝামেলা অনেক কষ্টের প্রতিটা রাত। এক্সামের ঠিক আগের দিনে কতোগুলো উড়ু সাজেসান আসতো, তবে যার রটে তার কিছুতো বটে। এসব পড়তে গিয়ে অনেকের আগেরদিন রাতের ঘুমটা হারাম হয়ে যেত। তারপরেও খাতায় ছাইপাস কিছু লিখে এসে দুপুরে হোস্টেলের কিছুটা কঠিন, কিছুটা তরল আর কিছুটা বায়বীয় খাবার খেয়ে দুপুরের শান্তির ঘুমের থেকে বড় কিছু ছিল না লাইফে। ঘুমের মাঝে তাড়া করে যেত দুঃস্বপ্নরা, ৫ মার্কের প্রশ্ন ভুল করে এসেছি, দুই মার্কের উত্তর দিয়ে ভুলে গেছি, পাস হবে তো? ৬ দিনের মহাযুদ্ধ পার হয়, ভাইভার রুটিন দিল। স্লাইড দেখা, সাজেসান, কোন এক্সটারনাল আসবে এসব নিয়ে কতো জল্পনা কল্পনা। এনাটমির সফটপার্ট মোটেই সফট না, আমাদের রহিম স্যারের কথাই কানে বাজত বারবার, “দেখবা তোমাদের কিছু ফ্রেন্ডরা পাস করে গেছে, আর কিছু ফ্রেন্ডরা এখনো *** এর ভিসেরা হাতে নিয়ে বসে আছে”। আর হার্ড পার্টে স্লাইড দেখতে মাইক্রোস্কোপের লেন্সের ভিতর দিয়ে তাকানোর বদলে ম্যাক্রোসকপিক ফাইনডিঙ্গস, স্লাইডে ছোট্ট করে লিখা নাম্বার অথবা স্লাইডের আকারআকৃতি দেখার জন্য বাইরে দিয়েই বেশী উঁকিঝুঁকি মারতাম। সেলিমরেজা আর পিন্টুশুভর হিস্টোলোজির কতো পেজ যে ছিঁড়ল পোলাপাইন। ভাইভা দিয়ে এসে ঝুম বৃষ্টি, পোলাপাইনের স্টেমিনার শেষ নাই। হৈচৈ করে হাফ প্যান্ট পরে মাঠে ফুটবল খেলতে গেলো, দুইতালার বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখে ভাবলাম, এইতো জীবন!

এরপর মাসখানেক পার, বাসায় প্রফ পরবর্তী ছুটি কাটিয়ে এর মধ্যেই ওয়ার্ড জীবন শুরু হয়ে গেছে। কোন একটা ছোট্ট ছুটিতে বাসায় যাওয়া, হটাত শুনি রেজাল্ট দিয়ে দিয়েছে, চিটাগাং মেডিকেলের এক মামাকে ফোন দিলে জানা যায় রেজাল্ট। হটাত মনে দুনিয়ার টেনশন, আরে বায়োকেম যে খারাপ দিসি, রেজাল্ট জেনে আর কি হবে। এদিক অদিক করতে করতে ফোন দিলামই শেষ পর্যন্ত, পাস শব্দটা কেমন শুনায় প্রতিটা ভালো খারাপ মেডিকেল স্টুডেন্টদের জীবনে ঠিক ঐ মুহূর্তেই সেটা বোঝা যায়। 





২য় প্রফঃ ২ বছরে কটকটা পাঁচটা সাবজেক্ট পড়ে জিবহার টেস্টবাডগুলো অনেক আগেই অনুভূতিশূন্য। প্রতিক্ষা কেবল “কেমনেতে এই পাঁচ বিষয়ের চক্কর থেকে বার হই”। কেউ কেউ ধরেই নিচেছে, সব সাবজেক্ট একবারে পার করা সম্ভব না, সিলেক্টিভ কিছু সাবজেক্ট ধরে তাই পড়া তাদের। যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন সূচক, ২য় প্রফের শিক্ষকদের মন বুঝে উত্তর দেয়া আসলেই অনেক কঠিন। উপরন্তু এই একটা প্রফ যখন আমরা সবাই বান্দর থাকি, বয়সের দোষ। পুরা ব্যাচ ল্যাপটপ না হয় ডেক্সটপ কিনে ফেলসে ১ম প্রফ পাস করে, হোস্টেল মোটামোটি বসুন্ধরার সিনেপ্লেক্স ছিল গত ২ বছর। কি শান্তি ছিল এই ২ বছরে টের পাওয়া যায় কমিউনিটি মেডিসিন রিটেনের আগে, সত্যি কথা মেজাজি স্যারদের সহানুভূতি রিটেনে না থাকলে যুদ্ধে যাওয়ার আগেই শহীদ হয়ে যাওয়া হতো। ফার্মার ২.৩০ ঘণ্টায় ২০X৩=৬০টা প্রমান সাইজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বন্ধুদের সাথে এক্সাম হলে কথা কাঁটাকাটি করে পুরাই ফ্রাসট্রেটেড। অন্যরকম পরীক্ষা ফরেনসিক, নিজে পুরাই হুমায়ুন আহমেদ। প্যাথলজি আর মাইক্রোতে হল কিছু আদান আর কিছু প্রদানের খেলা। এরপর ভাইভা, সবাই বলে ফাইনাল প্রফের ভাইভা ভীতিকর, ২য় প্রফের কথা কেন জানি সবার স্মৃতি থেকে বাদ পড়ে যায়, হয়তো এটা এতই ইজি অথবা এতই ভীতিকর যে আমরা এটার কথা মনে করে আর কষ্ট পেতে চাই না। সবগুলো মোটামোটি ভালো মতই পার করে দিলাম, ধরা খেলাম শেষের দিন ফার্মা ভাইভা দিতে এসে। আলী স্যারের কাছে শেষ বোর্ডের শেষ পরীক্ষার্থী হিসাবে ভাইভা। শেষ ভালো যার সব ভালো তার, কথাটার সার্থকতা প্রমান করতে গিয়ে শেষটাই খারাপ করলাম। এতো খারাপ ভাইভা আমি লাইফে আর কখনো দেই নাই। স্যার হতাশ হয়ে বললেন, আচ্ছা যাও।
এরপর তো ধরেই নিলাম ২য় প্রফ আর একবারে পার হচ্ছে না। সঙ্গীসাথী অনেক, ২/৩ জন ছাড়া কেউই সব সাবজেক্ট পাসের ব্যাপারে আশাবাদী না। মাস খানেক পর রেসাল্ট দিবে দিবে, ফ্রেন্ডদের রুমে বসে আছি, এমন সময় ফ্রেন্ড রেসাল্ট নিয়ে আসলো। শুনে স্তম্ভিত, ওদের রুমের সবাই ফেল, মাত্র ৪০% এর মতো পাস। কোনভাবে ঐ ৪০% এ আমিও রয়ে গেলাম, কিন্তু ২য় প্রফের রেসাল্ট আর যাই হয়, কাউকে খুশি করে যেতে পারেনি। আপনি হয় কাঁদবেন, কিন্তু হাসবেন না। নিজে পাস করেও যে মনে কতোটা অপূর্ণতা থেকে যায়, ২য় প্রফে এসে বুঝা যায়। আলী স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ রয়ে গেলাম, এতো খারাপ ভাইভা দিয়েও পাস এটা ভাবতে এখনো অবাক লাগে মাঝে মাঝে।

ফাইনাল প্রফের কাহিনী আর নাই বলি, জানুয়ারির ৪/৬ ডিগ্রি টেম্পারেচারের ভোরে বরফ শীতল পানিতে ২ ঘণ্টার ঘুম থেকে জেগে হাতমুখ ধোওয়ার গল্প আর যাই হোক, এই গরমের জুলাই মাসে মানায় না।

এতোকিছু লিখার একটাই কারন, ৩ দিন পর প্রফ পরীক্ষা। এটা হতাশার গল্প না, অনুপ্রেরণার গল্পও না। এতো হতাশ হবেন না, আবার খুব বেশী খুশিও হবেন না। যে যেমন কষ্ট করে গেছেন, তার প্রতিদান অবশ্যই পাবেন।
যারা হতাশাগ্রস্ত তাদের জন্য, অনেকসময় কষ্টের পরেও কষ্টের আশানুরূপ ফল আসে না, আবার অনেকে দেখবেন প্রত্যাশার চেয়ে বেশী কিছু পেয়ে গেছে। এটা নিয়ে ভাববেন না, নিজেকে নিজের মাপকাঠিতেই শুধুমাত্র দেখবেন। আপনার সিনিয়ররা সবাই পাস করে গেছেন, আপনিও কখনো থেমে থাকবেন না। মেডিকেল লাইফটা তো শুধু এই কয়েকটা পরীক্ষা নিয়ে না।
যারা অনেক ভালো রেজাল্টের প্রত্যাশী, তাঁদেরকে সবার বাইরে কিছু করতে হবে যা শুধু সময় আর ভাগ্যই বলে দিবে। আপনাকে শুধু এটা ঠিক সময়ে ঠিক ভাবে বুঝে নিতে হবে মাত্র।

সবাইকে প্রফের জন্য শুভকামনা রইল। সবার মনকামনা পূর্ণ হোক।