২০ অক্টোবর, ২০১৪

মেডিক্যাল এডমিশন টেস্ট ২০১৪

জেনেসিসঃ

সৃষ্টিকর্তার আদেশে সৃষ্টি হলেন প্রথম মানব এবং মানবী। ইসলাম ধর্ম অনুসারে যাদের নাম আদম এবং হাওয়া, এডাম এবং ইভ নাম তাদের ক্রিশ্চানধর্ম মতে। আর হিন্দুধর্ম অবলম্বনে তাঁদেরই নাম মনু এবং শতরূপা।

কিছু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো স্বর্গে বসবাসের জন্য করে। যেখানে তাদের জীবন হতো চির আনন্দময়, কোন রোগশোক, নিরানন্দ, হতাশা তাঁদেরকে স্পর্শ করতে পারতো না।

তাঁদের স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পতন হয় শয়তানের প্ররোচনায়, সৃষ্টিকর্তার নিষেধ করে দেয়া ইডেন বাগানের গন্ধম ফল খেতে গিয়ে। অতঃপর শুরু হয় তাঁদের এমন এক জীবনের যেখানে কষ্ট, রোগশোক আর হতাশা নিত্যসঙ্গী। (অরিজিনাল সিন / আদিমতম পাপ)

দিনগুলো ঘুরতেই মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা। সবার চোখের অগোচরে জীবন পাল্টে দেয়া একটি দিন। একটু খেয়াল করলে এর সাথে জেনেসিস আর আদিপাপের আবছা একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

শত অভিযোগ অপবাদ, কষ্ট আর হতাশা ভরা এক বিরামহীন ক্লান্তিময় জীবন মেডিকেল স্টুডেন্ট আর ডাক্তারদের। প্রবাদবাক্যে “কষ্টের ফল যেমন মধুর” বলা হয়, বাস্তবে সেটিও সবসময় ভাগ্যে জুটে না। গন্ধম ফলের মতোই অর্জনটা মিষ্টি মনে হয় শুধু ক্ষণিকের জন্যই।

তবুও কিছু ছেলেমেয়ে দুঃসাহস করে, বুড়োদের নিষেধ করে দেয়া এই গন্ধম ফল খেয়েই এই কঠিন জীবনে পা বাড়ায়। নিষেধ অমান্য করায় তাদের জন্য কোন অভিশাপ নয়, তাদের জন্য শুভকামনা।




কিছু সাহসী মানবমানবী স্বর্গচ্যুত না হলে বাকিদেরকে পৃথিবীতে স্বর্গের স্বাদ দিবে কে?

১০ অক্টোবর, ২০১৪

মানসিক স্বাস্থ্য দিবসঃ ১০ই অক্টোবর

আমাদের এক স্যারের সাইকিয়াট্রিতে পোস্টগ্রেজুয়েসন করার পরে পোস্টিং হল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের এনাটমি ডিপার্টমেন্টের লেকচারার হিসাবে। মেডিকেলে সাইকিয়াট্রি বিভাগ ছিল না তখন। সেই সময় কলেজের প্রথম বর্ষে আমাদের ক্লাসগুলো শুরু হয়েছে মাত্র। স্যার আমাদের আগ্রহের সাথেই এনাটমির হাড্ডিগুড্ডি পড়ান, ভিসেরা দেখান। আমরা পিছনে বসে হাসাহাসি করি, কই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নাকি আমাদের এনাটমির ক্লাস নেয়!

এবডমেন কার্ডে এসে ফিমেইল জেনিটাল অর্গান চ্যাপ্টারটা পড়ানোর দায়িত্ব স্যারের ভাগে পড়লো। এবারে সবার আড়ালে আবডালে হাসাহাসির পরিমানটা পর্বতপ্রমাণ হতে লাগলো। ক্লাসের মধ্যে প্রায়ই ছেলেমেয়ে সবার মিলিত কণ্ঠের “হাহা, হি হি” শব্দের হাসি শুনতে পাওয়া যায়। ভাইবা নিতে গিয়ে স্যারেরও মাঝেমাঝে হাসি চলে আসে। কি ওকওয়ার্ড অবস্থা। বছর ঘুরলো, প্রথম প্রফ পার করলাম। ভাবলাম এবার বুঝি সাইকির স্যার গেলেন নেটওয়ার্কের বাইরে।

বিধি বাম। ৩য় বর্ষে আমরা ক্লাস আর ওয়ার্ড শুরু করতে না করতেই কলেজে সাইকিয়াট্রি বিভাগ খুলে দেয়া হল। একমাত্র এসিসটেন্ট প্রফেসর হিসাবে স্যারেরই পদোন্নতি হল সেই বিভাগে। ক্লিনিকাল স্টুডেন্টদের সাইকিয়াট্রি বিভাগে প্লেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হল। কি যন্ত্রণা, এবার ঠিকই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাগলের চিকিৎসা নিয়ে শিখতে হবে!




ওয়ার্ডে কি সব অদ্ভুত সব রোগী, কথাবার্তা লাগাম ছাড়া। ৭ দিনের প্লেসমেন্ট ফাঁকিবাজি করে ২/৩দিন না গিয়ে কাটিয়ে দিলাম। স্যার আগ্রহ করে কথা বলতে গেলেই আমরা গল্পগুজব করে পাস কাটিয়ে যেতাম। পুরানো ছাত্র বলে স্যারও বেশী কঠিন হতে পারতেন না।

চতুর্থ বর্ষের প্লেসমেন্টে কোন সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড না পড়লেও সপ্তাহ দুয়েক পরপর কোন একদিন সাইকিয়াট্রি লেকচার ক্লাস পড়তো। ঘুমঘুম চোখে লেকচার শুনতে গিয়ে সবারই মনে হতো আমার কোন মানসিক রোগ আছে। কারো মনে হতো বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, কারো ডিপ্রেশন, কারোবা এন্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার।

ফাইনাল ইয়ারের সময়টা কেটে গেলো ধুমধাম করে। প্রফের আগে এসেসমেন্টের আগে শুনি মেডিসিনের সাইকিয়াট্রির ভাইবা বোর্ড থাকবে আলাদা। হায় হায়, প্রফের সময় একবারই পড়বো এই সাবজেক্ট ভেবে এটা কবেই রেখে দিয়েছিলাম বাকি বইয়ের তলায়। অল্প সময়ে মেডিসিনের একগাদা পড়ার ফাঁকে কোনমতে ঘণ্টা দুয়েক চোখ বুলালাম এন্ডেভার আর লেকচারের পাতায়, বিশাল সিলেবাস। শেষ হবে না ভেবে হাল ছেড়ে দিলাম প্রায়। ভাইবার হলে পুরনো সেই স্যার দেখি সিজোফ্রেনিয়ার এ বি সি ডি (Auditory Hallucination, Broadcasting of Thought, Controlled Thought, Delusion) পারতেই খুশী। এক স্যার, যাকে আমরা প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত ফেইস করে গেলাম।

ইন্টার্নীতে প্রথম সাইকিয়াট্রির প্রকোপটা অনুভব করলাম। এমিট্রিপটাইলিন, ক্লোনাজিপাম, ফ্লুপেন্টিক্সল+মেলিট্রাসিন ছাড়া কোন প্রেসক্রিপশন যেন সম্পূর্ণ হয় না, সেটা শুধু মেডিসিন স্পেশালিষ্টদের বেলাতেই। সাইকিয়াট্রির প্লেসমেন্টে আরও ট্রিটমেন্টের তো শেষ নাই। একটাই অনুধাবন হল, এদেশের মানুষ যত না শরীরের সমস্যায় ভোগে, তার থেকেও বেশী ভোগে মনের সমস্যায়। অভিজ্ঞতা থেকেই বলা, ডাক্তাররাও এর ব্যতিক্রম নয়।

সাইকিয়াট্রিস্টের কাজটা আমাদের দেশে খুব অমর্যাদাকর হিসাবে রয়ে গেছে অনেকের মনেই। আমেরিকায় বেতনের দিক থেকে ৩য় স্থানে থাকা এই জব হোল্ডারদের সমতুল্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে পরিচিত হন পাগলের ডাক্তার হিসাবে। তবুও দিন বদল চলছে, মানুষ এখন বুঝতে শিখছে। আমরাও এনাটমির সাইকিয়াট্রির হাসিঠাট্টার পর্যায় থেকে বুঝতে শিখে এর গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পারছি।

১০ অক্টোবর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। পরিবারে একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত সদস্য থাকলেই শুধু আমরা এর গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পারি। নিজের ভিতরেও যে কতো সমস্যাগুলোর বীজ বহন করে চলছি তা গোপনই থেকে যায়। শরীরের স্বাস্থ্যের সাথে মনের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই, এই কামনায়...

০১ অক্টোবর, ২০১৪

একজন ডাক্তারের মন মানসিকতার অন্তরাল থেকে...

ডিউটি রুমে বসে আছেন। হটাৎ ইন্টারকমে নার্সের ফোন। “ডক্টর, কেবিন ৪১৪-র রোগী খারাপ হয়ে গেছে, একটু দেখে যান।” স্টেথো আর বিপি হাতে কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। আগে থেকেই জানা বৃদ্ধের অবস্থা খারাপ, হাইয়ার সেন্টারগুলোতে রেফার করার পরেও রোগীর পার্টি অপারগতা জানিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চেয়েছে এখানেই।

বৃদ্ধের পাশে শুধু একজন মহিলা। একপলক রোগীকে দেখে অভিজ্ঞতাই জানিয়ে দিলো ডাক্তারকে, এই দেহ প্রাণহীন। তারপর শুধু নিয়মরক্ষার মতো পরীক্ষাগুলো করে গেলেন। শেষ করে ডেথ ডিক্লেয়ার করলেন ১.৪৫ মিনিটে। কথা শুনে পাশের মহিলা ফোঁস করে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুনলেন। এটাকি দীর্ঘদিন কষ্টে ভোগা মানুষটার মুক্তিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস নাকি বুকের গভীরে জমানো বেদনার প্রকাশ ডাক্তার বুঝতেই পারলেন না।

রোগীর ফাইল সিস্টারকে ডাক্তার রুমে পাঠাতে বলে ফিরতি পথে পা বাড়ালেন। দুই মুহূর্তের জন্য মনে প্রশ্ন এলো, আর কি কিছু করার ছিল রোগীর জন্য? ভিতর থেকে উত্তর আসলো, “না।”
এই স্বস্তিতে ডাক্তার আবার একটু পরেই ভুলে যাবেন বিষয়টি, মনে খুব একটা ছাপই ফেলবে না ব্যপারটা। এমন ঘটনা অনেকবার ঘটে গিয়েছে জীবনে। জীবন মরনের সেতুবন্ধনের পারাপারটা এখন ডাক্তারকে খুব একটা বিচলিত করে না।

বাস্তবে এই মেডিকেল স্টুডেন্ট আর ডাক্তারী জীবনটা চিকিৎসার জন্য জ্ঞানার্জনের সাথেসাথে কিছু খারাপ ধরনের মানসিক ক্ষমতা অর্জনের শিক্ষা। সোসিওপ্যাথিক অনেকগুলো গুন অর্জন না করলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যায় এই জীবনে।



একজন সোসিওপ্যাথের (Sociopath) আদর্শ বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করুনঃ
১) লজ্জাহীনতা ২) মিথ্যে বলার বিশেষ ক্ষমতা ৩) প্রতিকূল পরিবেশেও শান্ত থাকার প্রবনতা ৪) প্রথম দৃষ্টিতে মানুষের কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হবার ক্ষমতা ৫) সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিমান হবার বৈশিষ্ট্য ৬) মানুষকে মেনিপুলেট/ব্যবহার করার ক্ষমতা ৭) হটাৎ করেই প্রচণ্ড রাগ দেখানোর প্রবনতা ৮) হিউজ এগো বা গভীর আত্মসম্মানবোধ ৯) ক্রমাগত একদৃষ্টিতে কারো কথা শুনার ক্ষমতা ১০) মানুষের মুখ দেখে মনের ভাব বুঝতে পারার ক্ষমতা। ১১) বাইরে অনেক বন্ধুর মাঝে বাস্তবে খুব স্বল্পসংখ্যক সত্যিকারের বন্ধু ১২) যাদের বন্ধু মনে হয়, তাদেরকে সমাজের অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলার প্রবনতা।

নিজের সাথেই একবার মিলিয়ে দেখুন কয়টা ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন ইতিমধ্যে।

প্রথমবর্ষের প্রথম কার্ড ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো যেদিন, সেইদিনের কথা মনে পড়ে। ক্লাসের মাঝেই রেজাল্ট খারাপ হয়েছে শুনে অনেকেরই চোখে বাঁধ ভাঙ্গা কান্না। অনেকে ক্লাস থেকেও বের হয়ে গেলো। আজকে প্রায় ৭/৮ বছর পরে সেই আমাদেরই এখন রোগীর মৃত্যু দেখলেও একটু দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কোন অনুভূতি মনের মাঝে আসবে না। আরও অসংখ্য উদাহরণ পাবেন একটু খুঁজলেই, যেখানে নিজেই বুঝতে পারেন নিজের অনুভূতির ঘাটতি থেকে গেছে। মানবতার সেবা আর জ্ঞানার্জনের নামে নিজের আদি ও অকৃত্রিম অনুভূতিগুলো কতোখানি হারিয়ে ফেলেছেন একবার ভেবে দেখেছেন কি? নাকি হেসেই উড়িয়ে দিবেন এটাকে বড় হবার কুফল ভেবে?

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস

গতবছরের জুলাইয়ের দিকের কথা। ইন্টার্নশিপের অংশ হিসাবে কেজুয়ালিটিতে ডিউটি চলছে তখন। একদিন সন্ধ্যাবেলা ডিউটিরুমে বসে আছি আমি, সাথে আরেকজন সিনিয়র ভাইয়া। পেসেন্টের চাপ না থাকায় বসে বসে টিভি দেখছি। এমন সময় ওয়ার্ডবয় এসে খবর দিলো দুইটা বাচ্চা রোগী এসেছে। কেজুয়ালিটিতে বড়দের চিকিৎসার থেকেও খারাপ হল বাচ্চাদের চিকিৎসা করা। এরা সম্ভব হলে চিৎকার করে কানের পর্দা ফাটায়। তারপরেও নিতান্ত বাধ্য হয়েই পা বাড়ালাম।



ইমারজেন্সি রুমের ভিতরে ঢুকে আমার চক্ষু চড়কগাছ। দুটো বাচ্চার গাল, পিঠ আর হাত পায়ে শুধু কামড়ের দাগ! বাচ্চাগুলো সম্ভবত শকের কারনে কান্না করতেও ভুলে গেছে। বাচ্চার সাথের লোকজনকে জিজ্ঞেস জানলাম, এরা চাঁদপুর থেকে এসেছে। ওইখানে একটা এলাকায় এক কুকুর পাগল হয়ে সবাইকে কামড়ে দিচ্ছিল। বাচ্চাদুটো খেলার মাঠে গিয়ে সেই কুকুরের সামনে পড়ে গেছে। ওয়ার্ডবয়কে সাথে ডিউটিতে থাকা সিনিয়র ভাইকে ডাকতে বলে থার্ড ইয়ারের কমিউনিটি মেডিসিনের পাতায় কোনকালে পড়া রেবিস/জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা মনে করার চেষ্টা চালালাম। এর আগে কখনো এরকম কেইস দেখা হয়নি আমার। দ্রুত যা মনে পড়ে তা দিয়েই রোগীর পার্টির কাছে কিছু জিনিসপত্র আনার লিস্ট ধরিয়ে দিলাম। ভাইয়া এসে সাথে রেবিস ভ্যাক্সিনের নামটা যোগ করলেন।

ওয়ার্ড বয়ের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক ভাবে নরমাল স্যালাইন এনে কামড়ের জায়গাগুলোতে ঢালা হল। এবার বাচ্চাগুলোর কান্না শুরু হল। মায়াদয়া না দেখিয়ে বেশ নির্মমভাবেই কামড়ের জায়গাগুলো জ্বালাময়ী সব সাবান, এন্টিসেপটিক সল্যুশন দিয়ে ওয়াশ করতে হল। এদের মুখের উপরে গালের চামড়াগুলো ক্ষতবিক্ষত। রোগীর মা বারবার বলতে লাগলেন, আমার মেয়ের গালটা অন্তত সেলাই করে ঠিক করে দেন। অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত বুঝানো হল রোগীর চিকিৎসার স্বার্থেই রোগীর কোন ক্ষততে তাৎক্ষণিক ভাবে সেলাই করে দেয়া যাবে না। তবুও মায়ের কান্না আর থামে না।
শেষমেশ ওয়াশ আর এন্টিরেবিস ভ্যাক্সিন দেয়া শেষ হবার পড়ে গ্লাভস খুলে মোবাইলটা বের করলাম। আর কোন কিছু বাদ পড়লো কিনা জানা দরকার। আরেক সিনিয়র ভাইয়াকে ফোন দিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলার পর গালে আর ঘাড়ে কামড়ের কথা শুনে তিনি ক্যাটাগরি-৩ রেবিস এক্সপোজার হিসাবে পেসেন্টকে রেবিস ভেক্সিনের সাথেসাথে রেবিস ইউমিনোগ্লবিউলিন দেয়া প্রয়োজন বলে ধারনা করলেন। এরপর আরেক বিপত্তি, এটা নাকি কুমিল্লায় পাওয়া যায় না। এমনকি ঢাকার অনেক নামীদামী ফার্মেসীতেও পাওয়া যায়না। শেষমেশ তিনি খোঁজ নিয়ে জানালেন, খুব সীমিত পর্যায়ে মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে এটার সরবরাহ রয়েছে। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা আর এন্টিরেবিস ভ্যাক্সিন দেয়ার পড়ে রেবিস ইউমিনোগ্লবিউলিন দেয়ার জন্য বাচ্চা দুটোকে সেখানে রেফার করা হল।
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক রোগ দিবস। এই রোগ এমনই ভয়ঙ্কর যে একবার রোগের লক্ষন দেখা দিলে ধরে নিতে হয় মৃত্যু একশত ভাগ নিশ্চিত। এই পর্যন্ত পৃথিবীতে শুধুমাত্র ৭ জন ব্যাক্তি এই রোগ হবার পরে জীবিত ছিল, সেটাও সাথে সাথে ভ্যাক্সিন সহ আরও অন্যান্য চিকিৎসার জোরে। কিন্তু বাকিদের ভাগ্য এতো প্রসন্ন হয় না। এদের জন্য থাকে বেদনাদায়ক মৃত্যু। অথচ এই রোগ সঠিক চিকিৎসায় ১০০% ই প্রতিরোধযোগ্য।

জলাতঙ্ক বা রেবিস নিয়ে অনেক কথাবার্তা হলেও এটাকে নিয়ে জানার কিছুটা দিকে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। এর কিছুটা পূরণে রেবিস নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা তুলে ধরছি।

রেবিস/জলাতঙ্ক রোগ কি?

- এটি একটি ভাইরাস সৃষ্ট রোগ। রেবিস ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত কুকুর, শিয়াল, নেকড়ে, বাদুড় এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ঘোড়া এবং গরুর দেহ থেকে এটি মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে ৯৬% ক্ষেত্রে কুকুর থেকেই (কুকুরের কামড় অথবা লালা থেকে) এই রোগ মানবদেহে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি আক্রান্ত স্থানের নার্ভটিস্যুতে প্রবেশ করে এবং প্রতিদিন ১২-২৪মিমি করে ব্রেইন এবং স্পাইনাল কর্ডের দিকে এগুতে থাকে। রেবিস ভাইরাস একবার ব্রেন টিস্যুতে প্রবেশ করলে মৃত্যু নিশ্চিত। কামড়/আক্রান্ত হওয়া থেকে রোগের লক্ষন প্রকাশ পাওয়ার সময়কাল কয়েকদিন থেকে শুরু করে এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু লক্ষন প্রকাশের ১ থেকে ৭ দিনের মাঝে রোগী যতই চিকিৎসা করা হোক না কেন, শেষমেশ মারাই যায়। তাই সংক্রামক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পরপরই লক্ষন প্রকাশের আগেভাগেই উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়াই এই রোগের হাত থেকে বাঁচার উপায়।

রোগে আক্রান্ত কুকুরের লক্ষন কি?

- ১) কোন কারন ছাড়াই কামড় দেয়ার প্রবনতা। ২) কারন ছাড়াই ছুটাছুটি এবং গর্জনের প্রবণতা। ৩) মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালাক্ষরণ হতে থাকা।

আক্রান্ত রোগীর লক্ষন কি?

- ১) আক্রান্ত জায়গায় প্রাথমিক ভাবে ব্যাথা এবং চিনচিনে অনুভূতি। ২) পানির প্রতি ভীতি (যে কারনে রোগের নাম জলাতঙ্ক)। ৩) অস্থিরতা, অতিরিক্ত লালাক্ষরণ, খিঁচুনি এবং সবশেষে মৃত্যু।
কোন কুকুরের কামড় খেলে প্রাথমিক ভাবে কি করবেন?

- টেপের পানি/নরমাল স্যালাইন হাতের কাছে যাই পান তা দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা। সাথে সাবান ব্যবহার করে যতটুকু সম্ভব ফেনা তুলে ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার করা। এরপর পভিডন আয়োডিন অথবা ডেটল অথবা সেভ্লন সল্যুশন ব্যবহার করে ক্ষতস্থান আবারো পরিষ্কার করা। সবকিছুর প্রথমে নিজের সেফটির জন্য গ্লাভস পরে নিবেন অবশ্যই। যত দ্রুত সম্ভব, ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

লেখার এই অংশটা মেডিক্যাল স্টুডেন্ট / আমার মতো অজ্ঞ ডাক্তারদের জন্যঃ

## কি মেসেজঃ

- ওয়াশ, ওয়াশ এন্ড ওয়াশ। ক্ষতস্থানে কোন সেলাই দিবেন না। একটু দেরী করে সেকেন্ডারি ক্লোজার করাই ভালো। শুধু অতিরিক্ত রক্তপাত হলে সেটি বন্ধের ব্যবস্থা নিবেন।

- ভ্যাক্সিন শিডিউলঃ ১) ইসেন শিডিউল অনুসারে ৫ দিন ৫ ডোজ। ডে-০, ডে-৩, ডে-৭, ডে-১৪ এবং ডে-২৮ এ ইন্ট্রামাস্কুলার ইঞ্জেক্সন। ২) জেগরেব শিডিউল অনুসারে ৩ দিনে ৪ ডোজ। ডে-০ তে দুই হাতে দুটো ডোজ তারপর ডে-৭ আর ডে-২১ এ আরেকটা ডোজ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জেগরেব শিডিউলকে আদর্শ ধরা হয়ছে। এই ভ্যাক্সিনগুলো সদর হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। আবার দোকানেও কিনতে মিলে। প্রেগন্যান্ট মহিলাকেও এটি দেয়া যাবে।

- ইমিউনোগ্লবিউলিনঃ ক্যাটাগরি-৩ ইঞ্জুরির (মাল্টিপল বাইট, হাতের আঙুল, মুখ, গলা যেসব অংশে নার্ভ সাপ্লাই বেশী সেই সব জায়গায় কামড়) ক্ষেত্রে ভেক্সিনের সাথে ইমিউনোগ্লবুলিন দেয়া উচিৎ। প্রথম ডোজের ভ্যাক্সিন দেয়ার সাতদিনের মাঝেই এটা দিতে হবে। এটি ক্ষতস্থানে (২০IU/Kg maximum 1500IU) ইনফিল্ট্রেট করে দেয়া হয় মূলত, আবার ডেলটয়েড মাসলের দেয়া যাবে। তবে ভ্যাক্সিন যে জায়গায় দিয়েছেন সেই জায়গায় না এবং ভ্যাক্সিন আর ইমিউনোগ্লবিউলিন দেয়ার জন্য পৃথক পৃথক সিরিঞ্জ ব্যাবহার করতে হবে। ইমিউনোগ্লবিউলিন বায়োলজিকাল প্রডাক্ট বলে রিএকশন করতে পারে, তাই সেটার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত (এড্রেনালিন, হাইড্রোকরটিসন, ফেনারগন, রেনিটিডীন ইনজেকশন) রাখতে হবে।

দেশে সংক্রামক রোগের ন্যাশনাল গাইডলাইনে জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসার সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। একইসাথে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের আরেকটি গাইডলাইন আছে। দুটোর পিডিএফ ফাইল হিসাবে নিচে ডাউনলোডের জন্য দিয়ে দিলাম।

জলাতঙ্ক নিয়ে জাতীয় গাইডলাইন (২০১০) – http://goo.gl/75OxqE
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন গাইডলাইন - http://goo.gl/OZiQZK

Update: Incepta has also brought Rabix-IG, which should be available countrywide. 

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মেডিক্যালীয় রহস্যঃ সিন্ড্রোম এক্স

ছোটবেলায় প্রতি শুক্রবারেই দেখতাম মামাতো ভাইদের গভীর আগ্রহে বিটিভিতে “The X-files” সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে। টিভি সিরিয়ালটা শুরু হতো বিটিভির রাতের খবরের পরে। অনেক আগ্রহ নিয়ে আমিও সারাদিন অপেক্ষা করে রাতের খবর দেখতে দেখতে কখন যে সিরিয়াল শুরু হবার আগেই ঘুমিয়ে পরতাম, বলতেও পারতাম না। পরদিন সকালে উঠে আফসোসের সীমা থাকতো না। মাঝেমাঝে দুই-একদিন বিরক্তির সীমা কাটিয়ে রাতের খবর পার করে সিরিয়ালের সময় পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে “The X-files” এর সূচনায় মিউজিকটা শুনেই একরকম শিহরণ জাগতো। প্রতি পর্বে রোমহর্ষক এক একটা রহস্য, সমাধানের বাইরে! “X” শব্দটাই যেন রহস্যময়।

The X-files এর হয়তো অনেকটাই কাল্পনিক। কিন্তু চিরকাল এই “X” শব্দটা মানুষকে রহস্যের স্বাদ দিয়ে গেছে। আমার চিরাচরিত মেডিকেল প্রসঙ্গ নিয়ে আসি, মেডিকেলের এমনই একটা অমীমাংসিত কেইসকে এখনো বলা হয় “Syndrome X”।

১৯৯৩ সালের ৮ই জানুয়ারিতে আমেরিকার বাল্টিমোরের মেরিল্যান্ডের জন্ম নেয় এক মেয়ে শিশু, নাম দেয়া হয় ব্রক গ্রীনবারগ (Brooke Greenberg)। জন্মের সময় পায়ের একটা হাড় কোমরের একটা জয়েণ্ট থেকে একটু আলাদা থাকা (হিপ ডিসলোকেশন) এই ছাড়া আর কোন সমস্যাই ছিল না তার। এই সমস্যা অপারেশন করে ঠিক করে দেয়া হয়, ব্রুককে স্বাভাবিক সুস্থ বাচ্চার মতোই দেখায় তখন।

এরপর ৬ বছর বয়সের মধ্যে তাকে একের পর এক মেডিকেলীয় সমস্যার মধ্য দিয়ে পার করতে হয়, একবার স্টোমাকে পারফরেসন (পাকস্থলীতে ফুটো হয়ে যাওয়া), একবার খিঁচুনি, একবার ব্রেন স্ট্রোক। এমনকি একবার ব্রেন টিউমার ডায়গ্নসিস হওয়ার পর কয়েকদিন পর টিউমারটি গায়েব হয়ে যায়।
একসময় হটাৎ করেই ব্রকের বাবা লক্ষ্য করেন যে মেয়ের বয়সের সাথে আর শরীরটা বাড়ছে না। ব্রকের ছোটবোন শারীরিক ভাবে বড় হয়ে ব্রককেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে! তার ধারণার সাথে ডাক্তাররাও প্রমাণ খুঁজে পান যে ব্রকের বয়স বাড়া হটাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রকের ক্রমোজম পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ক্রমোজমের সাথে তার ক্রমোজমের কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না তখন। এমনকি ক্রমোজমের যেসব অংশ বয়স নিয়ন্ত্রণ করে এবং বয়স সংক্রান্ত রোগ ঘটায় (যেমনঃ প্রজেরিয়া) এরকম এবনরমাল ডিএনএ বা কোনকিছুই পাওয়া যায়নি তার পুরো ডিএনএ সিকুন্যন্সিং করানোর পরেও।



ব্রকের সাথে জন্ম নেয়া ছেলে মেয়েরা স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে ঢুকে পড়ে, কিন্তু ব্রকের চেহারা, মানসিকতা এবং আচার আচরণ থেকে যায় ছোট বাচ্চার মতো। ১৬ বছর পার করা ব্রকের ব্রেইন পরীক্ষা করে দেখা যায় সেটা ছোট বাচ্চার ব্রেনের থেকে বেশী কিছুতে ডেভলাপ করেনি। তার মন ছিল ৮ থেকে ১২ মাস বয়সী বাচ্চার মতো। ব্রক বড় হতে থাকে তার ছোটবোনের কোলে। ব্রক ছোটবাচ্চাদের মতোই কথা বলতে পারতো না, শুধু মুখ দিয়ে কিছু শব্দ করতে পারতো। হাড় বা দাঁতগুলোও ছিল অপরিপক্ক। শুধু বাড়তো তার চুল আর নখটুকু। দেহের বিভিন্ন অংশের একেক রকম বাড়তে দেখে বিজ্ঞানীরা এখনো ধারনা করেন ব্রকের শরীরের একেকটা সেল ছিল একেক বয়সের। যেন একেকটা আলাদা আলাদা গাড়িতে করে চলা। একে ব্যাখ্যা করার মতো আজো উপযুক্ত কোন কারন খুঁজে পাননি তাঁরা। ব্রককে নিয়ে প্রচুর গবেষণা এবং ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়, ইচ্ছে হলে গুগুলে Brooke Greenberg লিখে একটু খুজলেই দেখতে পাবেন।

১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সাল, ২০টি বছর ছোট্ট বাচ্চা থাকার পরে যে হাসপাতালে ব্রক জন্ম নিয়েছিল ঠিক সেই হাসপাতালেই মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর কারনটা পারিবারিক ভাবে গোপন রাখা হয়। শুধু ব্রক না, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম আরও কিছু বাচ্চার প্রায় একই রকম কেস খুঁজে পাওয়া যায়। সবগুলোই এখন চলমান গবেষণার কেস। এখনো পর্যন্ত অমীমাংসিত এই রোগ (??) অথবা রহস্যের নাম দেয়া হয় “সিন্ড্রোম-এক্স”। এগুলোই বাস্তব জীবনের সত্যিকারের এক্স ফাইল।।