১৪ এপ্রিল, ২০১৫

শুভ নববর্ষ, ১৪২২

হেলা বৈশাখ, ১৪২০। ২০১৩ সালের পহেলা বৈশাখ। ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার রেজাল্ট এর কিছুদিন আগে দিয়েছে মাত্র। নব্যসৃষ্ট আমরা উৎসাহী ডাক্তাররা হাসপাতালে ইন্টার্নীতে নতুন বছরের আগেই শুরু করবো কিনা এই নিয়ে বিস্তর গবেষণার পর ঠিক হল, ১৭তম ব্যাচের ইন্টার্ন শুরু করার দিনটিও হবে ইংরেজি মাসের ১৭ তারিখ। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের আরও ৩ দিন পর। এই ৩ দিনের ছুটির সুযোগে বাসায় ঘুরে আসতে চলে গেলো ব্যাচম্যাট প্রায় সবাই। ক্যাম্পাসে রয়ে গেলাম আমরা অল্প কয়েকজন।

সেইবার ক্যাম্পাসে পহেলা বৈশাখ পালন করতে গিয়ে পরিচিত অপরিচিত মুখগুলোর ভিড়ে থেকেও নিজেদের তেমন উপস্থিতি না থাকায় যেন কিছুটা ঘাটতি রয়ে গেলো উৎসবের আনন্দে। তবে চোখের সামনেই দেখতে পেলাম মেডিকেল কলেজের ১৬তম ব্যাচের পহেলা বৈশাখের আনন্দকে। বিদায়ক্ষণে ক্যাম্পাসের শেষ পহেলা বৈশাখকে স্মৃতিতে জড়িয়ে রাখার প্রচেষ্টা।

এরপর দিন গেলো, মাস গেলো। ইন্টার্নীর সময়টা পার করে অনেক দ্রুতই যেন চলে এলো আরেক পহেলা বৈশাখ, ১৪২১। নতুন বছরের আগমনবানী মনে করিয়ে দিলো, আমাদেরও বিদায়ের সময় সন্নিকটে। তবে এবার ক্যাম্পাসের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে আমাদের ১৭তম ব্যাচের সকলেই উপস্থিত। সবার উপস্থিতিতে সম্ভবত ক্যাম্পাস জীবনের সবচেয়ে স্মৃতি বিজড়িত পহেলা বৈশাখ।




যেকোনো উৎসবে আনন্দের উৎস অনুষ্ঠানের উপকরণ, তথাকথিত আচারব্যবহার, গান এসব না যতটুকু, তার চাইতেও বেশী আনন্দের উৎস হয়ে দাড়ায় উৎসবের অংশ নেয়া মানুষগুলি। সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে চেনা পরিচিতির গণ্ডীর মাঝে থাকা কাছের এবং দূরের মানুষগুলো যখন একসাথে জড়ো হয়, তখন যে আনন্দের জন্ম নেয় তার কোন তুলনা হয়ে উঠে না।


পহেলা বৈশাখ আর ১৪২২ প্রিয়জনদের সাথে সকলের আনন্দে কাটুক, নতুন বছর সবার জন্য স্বপ্নপূরণের বার্তা নিয়ে আসুক, এই প্রত্যাশায়।।

২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অমর একুশের স্মরণে...

খুব ছোটবেলায় জাতীয় সরকারী ছুটির দিনগুলি কোনটা কিসের জন্য, সেটা মনে রাখতে বেশ হিমসিম খেতাম। সরকার বদলের সাথে সাথে ক্যালেন্ডারের কিছু ছুটির দিনের বদল হতো। তবুও যে কয়টি দিন কখনো ভুলে যাওয়া হয়নি এদের মাঝে একটি, একুশে ফেব্রুয়ারি।



স্কুলের ক্লাসের একটু উপরের দিকে উঠার পর থেকেই বাংলা রচনার কলামে প্রশ্ন আসতে লাগলো, একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা হাইকোর্ট, ভাষা আন্দোলন এমন কিছু শব্দ নিজের অজান্তেই মনে গেঁথে গেলো স্বর্ণাক্ষরে। আরও কিছু বছর পার হল। নতুন মেলেনিয়ামে ইউনিস্কোর সহযোগিতায় একুশে ফেব্রুয়ারি ততদিনে রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। বাংলা রচনার শিরোনামটা পাল্টে গেলো সেই সুবাদে। রচনার বর্ণনায় যুক্ত হল আরও কিছু তথ্যউপাত্ত। জানলাম ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে পৃথিবীর বুকে নাম করে নেয়া জাতি একমাত্র আমরাই।

গত কয়েকটা বছর ধরে বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই লেখাপড়া হয়ে উঠে বেশী। তারপরও কোথাও বাংলায় কিছু লিখতে পারার সুযোগ হলে, নিজের অজান্তেই মনে আনন্দ জাগে। হোক সেটা ফেসবুকে ওয়ালে অথবা প্রেসক্রিপশনের উপদেশের পাতায়। মা আর মাতৃভাষার বুঝি কোন তুলনা হয় না।

কয়েকদিন আগে কারন ছাড়াই মনে প্রশ্ন এসেছিলো, আমি চাইলে পৃথিবীর ঠিক কতো শতাংশ লোকের সাথে কথা বলতে পারবো। অবাক হয়েই ভেবে দেখলাম, পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ ভাষা আমার মাতৃভাষা আর ইংরেজিকে যদি দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেই গণ্য করি তাহলে সব মিলিয়ে খুব কম হলেও অর্ধেকেরও বেশী লোকের সাথে অন্তত ভাবের আদানপ্রদান করা সম্ভব।

ঘুরেফিরে সবকিছুর পিছনে একটাই দিন। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। কিছু সংগ্রামী তরুণের দেখানো পথ ধরেই এতোদূর আসা। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা।

০৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

প্রসঙ্গঃ বাংলাদেশের রোগীদের বিদেশপ্রীতি

চিকিৎসাক্ষেত্রে বাঙ্গালীর বিদেশপ্রীতি দেখে প্রথমদিকে খানিকটা বিরক্তই হতাম। এখন একটু হতাশাগ্রস্ত হই। এদেশের মানুষের মুক্ত চিন্তাভাবনার অভাব দেখে। রবি ঠাকুরের কবিতা, “বহুদিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যায় করি, বহু দেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে শুধু দু'পা ফেলিয়া, একটা ধানের শীষের উপর, একটি শিশির বিন্দু!” বিদেশথেকে আগত রোগীদের চিকিৎসার বর্ণনা এবং প্রেসক্রিপশনগুলো প্রায়শই এই কবিতাটাই মনে করিয়ে দেয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ছোটখাট কিছু উদাহরণ…


১) ২০ বছর বয়সী এক প্রবাসী যুবক দুবাইয়ে কর্মরত অবস্থায় হটাৎ পেটে ব্যাথা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হবার পরে দিন দুয়েক পর তার রোগ ডায়গ্নোসিস করা হল ডায়বেটিক কিটোএসিডোসিস। রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হল, ইনসুলিন দিয়ে। রোগী কিছুটা স্টেবল হওয়ার পর তাকে দ্রুত জানানো হল যে এই রোগের চিকিৎসার খরচ অনেক, দেশে ফিরে গিয়ে চিকিৎসা করালেই ভালো হবে। রোগী দেশে ফিরত আসলো, বাসায় আসার পথেই অর্ধসুস্থ রোগী আবার অনিয়মিত ইনসুলিনের কারনে আবার অসুস্থ হয়ে ডায়বেটিক হাসপাতালে ভর্তি হল। নিজের আগ্রহেই খোঁজ নিলাম, কেমন সেখানের চিকিৎসা ব্যবস্থা। সহজসরল ছেলেটার কথায় যা বুঝতে পারলাম, ঐখানে রোগীদের জন্য ডাক্তারের ভাগ আছে। এদেশের রোগীদের জন্য ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এসব দেশের ডাক্তার নির্ধারিত। চিকিৎসাখাতের ব্যয়ভারবহনের গ্যারান্টি না থাকলে বুঝিয়ে শুনিয়ে রোগীকে দেশে ফিরত পাঠানো হয়। ব্যবস্থাপত্রটাও খেয়াল করলাম। রেকর্ডকিপিং এর দিক থেকে সেটাকে দশে দশ দিতে পারলেও ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে আধুনিকগাইড লাইনের কোন কিছুই ফলো করা হয়নি। ডায়বেটিক কিটোএসিডোসিসের মতো মেডিকেল ইমারজেন্সিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে ইনসুলিন ৩০/৭০ (শর্ট একটিং + ইন্টারমিডিয়েট একটিং ইনসুলিনের মিক্সচার) দিয়ে। ডিসচার্জের কন্ডিসনে পেসেন্টকে দেখানো হয়েছে স্টেবল। আবার পেসেন্টকে দুটো ইনসুলিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে মুখে বলা হয়েছে খরচ বেশী দেখে বাসায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে। আমাদের গরীব দেশেও ডায়বেটিক কিটোএসিডোসিসের ট্রিটমেন্টের জন্য ইনসুলিন – আর (শর্ট এক্টিং ইনসুলিন) ব্যবহার করা হয়, যার দাম পড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। বিদেশে যদি এই চিকিৎসার জন্যই খরচ বেশী হবে বলে দেশে পেসেন্টকে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তখন স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞবোধ করি যে মেডিকেল লাইনের ভালোমন্দ, সত্যমিথ্যে বোঝার মতো ক্ষমতাটা কিছুটা হলেও অন্তত তিনি দিয়েছেন।


২) ক্রনিক কিডনি ডিজিসের এক রোগী এসে ডাক্তাররুমে খোঁজ নিচ্ছেন ডায়ালাইসিসের খরচ কেমন পড়বে। বেশ সামান্য অঙ্কের দাম শুনে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন মেশিন ভালো কাজ করে কিনা। এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে একটু বিপাকে পড়লাম। বললাম সবার জন্যতো ভালোই কাজ করে, আপনারও হয়ে যাবে আশা করি। রোগীর সাথে আসা পাশেই দাঁড়ানো আরেক বিজ্ঞ ভদ্রলোক মাঝখান থেকে কথা বলা শুরু করলেন, “আরে আমিতো দেড়লাখ টাকা খরচ করে ইন্ডিয়া থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসলাম, ঐ চিকিৎসার সাথে এখানের চিকিৎসার তুলনা হবে নাকি আবার!” একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম কি চিকিৎসা দিলো। ভদ্রলোকের উত্তরে যা বুঝতে পারলাম, সেরাম ক্রিয়েটিনিন ২.৫ মিগ্রা/ডেলি এর কাছাকাছি থাকায় ইন্ডিয়ার কোন এক হাসপাতালে গিয়ে কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করিয়ে তিনি খুব ভালো চিকিৎসা পেয়েছেন। ডাক্তার তাকে উপদেশ দিয়েছেন পাতে অতিরিক্ত লবন না খেতে, মাছমাংস কম পরিমানে খেতে, প্রতিদিন ১.৫লিটারের বেশী পানি না পান করতে আর প্রেসার নিয়ন্ত্রনে রাখতে। এতে তিনি খুব উপকার পেয়েছেন। অবাক হলাম, হায়রে মানুষ। এই উপদেশগুলোর মূল্য দেড়লাখ টাকা! বিদায় জানানোর সময় রোগীকে বললাম ইন্ডিয়ার ডায়ালাইসিস মেশিনগুলো খুবই ভালো হবে। ভদ্রলোক আবারো একটু সন্দেহের চোখে তাকাতে তাকাতে বিদায় নিলেন।


৩) আজকে আরেক রোগী ভর্তি দেয়ার সুযোগ হল। ডায়বেটিক + হাইপারটেন্সিভ + ওল্ড এম.আই (পুরানো হার্ট এটাক) রোগী হাইপোগ্লাইসেমিয়া (সুগার কমে যাওয়া) নিয়ে ভর্তি হয়েছে। রোগীর সাথে জনাপাঁচেক এটেনন্ডেন্ট, সবাই স্যুটেড বুটেড। রোগীকে নিয়ে এসেই সামান্য পরেই প্রশ্ন, ওয়ার্ডের বেডের চার্জ কতো আর কেবিনের ভাড়া কতো। শুনে তারা ডিসিশন দিলেন রোগীকে ওয়ার্ডে রাখা হবে। রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়ার (২.৪মিমোল/লি) প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে বেডে পাঠিয়ে সিস্টারকে মৌখিক অর্ডার দিয়ে রোগীর চলতি ব্যবস্থাপত্রের দিকে তাকালাম। ইন্ডিয়ার ভ্যালোরের এক মেডিকেল কলেজের একটি মেডিসিন ইউনিট থেকে ইস্যু করা হয়েছে। যথারীতি, হিস্ট্রির আর এক্সামিন্সন ফাইন্ডিংস, রিপোর্ট খুব সুন্দর করে লেখা হয়েছে। মনোযোগ দিয়ে পড়ছি দেখে পাশে দাঁড়ানো রোগীর এটেনডেন্স বলল, ওইখানের চিকিৎসাব্যবস্থা খুব ভালো। ডাক্তার ঘণ্টায় ঘণ্টায় এসে খোঁজ নিয়ে যায় রোগী কেমন আছে। রোগীর ডায়বেটিস দুই দিনে কমিয়ে দিয়েছে। হু, হু করতে করতে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে প্রেস্ক্রিপসনের পাতায় গেলাম। রোগীর ডায়বেটিসের চিকিৎসা দেখে মুখ হাঁ হয়ে গেল। ট্যাবলেট মেটফরমিন (৫০০মিগ্রা) ২+২+২ – প্রতিদিন, ট্যাবলেট গ্লিপিজাইড ৫মিগ্রা ১+০+১ – প্রতিদিন, আবার সাথে ইনজেকশন ইনসুলিন (৩০/৭০) ১৪+০+১২ ইউনিট। এরই সাথে আরো বিভিন্ন ড্রাগের সাথে কার্ডিয়াক ড্রাগ হিসাবে হাই-ডোজে নন-সিলেক্টিভ বিটা-ব্লকার। ডাক্তারী লাইনের স্বল্পজ্ঞানের মাঝেই এসব অবাক হলাম। রোগী যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া নিয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়ে উঠেনি এটাই বরং আশ্চর্যের।

আরও আশ্চর্যের ভাবনা এলো, আমাদের দেশের কর্কশমুখের সস্তা ডাক্তারদের চিকিৎসা এড়াতে রোগীরাই লাখ টাকা খরচ করে বাইরে এই ধরনের চিকিৎসা নিতে বাইরে যান। দেশের বাইরের এই ধরনের চিকিৎসা আর ডাক্তারের বেশধারী কাউন্সিলারদের ঘণ্টায় ঘণ্টায় মিষ্টিকথায়ই রোগীরা খুশী!

“মিষ্টি কথায় চিঁড়া ভিজে না” - এই বাক্য এইদেশের কিছু রোগীদের জন্য পুরোটাই ভুল প্রমানিত।

২০ অক্টোবর, ২০১৪

মেডিক্যাল এডমিশন টেস্ট ২০১৪

জেনেসিসঃ

সৃষ্টিকর্তার আদেশে সৃষ্টি হলেন প্রথম মানব এবং মানবী। ইসলাম ধর্ম অনুসারে যাদের নাম আদম এবং হাওয়া, এডাম এবং ইভ নাম তাদের ক্রিশ্চানধর্ম মতে। আর হিন্দুধর্ম অবলম্বনে তাঁদেরই নাম মনু এবং শতরূপা।

কিছু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো স্বর্গে বসবাসের জন্য করে। যেখানে তাদের জীবন হতো চির আনন্দময়, কোন রোগশোক, নিরানন্দ, হতাশা তাঁদেরকে স্পর্শ করতে পারতো না।

তাঁদের স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পতন হয় শয়তানের প্ররোচনায়, সৃষ্টিকর্তার নিষেধ করে দেয়া ইডেন বাগানের গন্ধম ফল খেতে গিয়ে। অতঃপর শুরু হয় তাঁদের এমন এক জীবনের যেখানে কষ্ট, রোগশোক আর হতাশা নিত্যসঙ্গী। (অরিজিনাল সিন / আদিমতম পাপ)

দিনগুলো ঘুরতেই মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা। সবার চোখের অগোচরে জীবন পাল্টে দেয়া একটি দিন। একটু খেয়াল করলে এর সাথে জেনেসিস আর আদিপাপের আবছা একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

শত অভিযোগ অপবাদ, কষ্ট আর হতাশা ভরা এক বিরামহীন ক্লান্তিময় জীবন মেডিকেল স্টুডেন্ট আর ডাক্তারদের। প্রবাদবাক্যে “কষ্টের ফল যেমন মধুর” বলা হয়, বাস্তবে সেটিও সবসময় ভাগ্যে জুটে না। গন্ধম ফলের মতোই অর্জনটা মিষ্টি মনে হয় শুধু ক্ষণিকের জন্যই।

তবুও কিছু ছেলেমেয়ে দুঃসাহস করে, বুড়োদের নিষেধ করে দেয়া এই গন্ধম ফল খেয়েই এই কঠিন জীবনে পা বাড়ায়। নিষেধ অমান্য করায় তাদের জন্য কোন অভিশাপ নয়, তাদের জন্য শুভকামনা।




কিছু সাহসী মানবমানবী স্বর্গচ্যুত না হলে বাকিদেরকে পৃথিবীতে স্বর্গের স্বাদ দিবে কে?

১০ অক্টোবর, ২০১৪

মানসিক স্বাস্থ্য দিবসঃ ১০ই অক্টোবর

আমাদের এক স্যারের সাইকিয়াট্রিতে পোস্টগ্রেজুয়েসন করার পরে পোস্টিং হল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের এনাটমি ডিপার্টমেন্টের লেকচারার হিসাবে। মেডিকেলে সাইকিয়াট্রি বিভাগ ছিল না তখন। সেই সময় কলেজের প্রথম বর্ষে আমাদের ক্লাসগুলো শুরু হয়েছে মাত্র। স্যার আমাদের আগ্রহের সাথেই এনাটমির হাড্ডিগুড্ডি পড়ান, ভিসেরা দেখান। আমরা পিছনে বসে হাসাহাসি করি, কই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নাকি আমাদের এনাটমির ক্লাস নেয়!

এবডমেন কার্ডে এসে ফিমেইল জেনিটাল অর্গান চ্যাপ্টারটা পড়ানোর দায়িত্ব স্যারের ভাগে পড়লো। এবারে সবার আড়ালে আবডালে হাসাহাসির পরিমানটা পর্বতপ্রমাণ হতে লাগলো। ক্লাসের মধ্যে প্রায়ই ছেলেমেয়ে সবার মিলিত কণ্ঠের “হাহা, হি হি” শব্দের হাসি শুনতে পাওয়া যায়। ভাইবা নিতে গিয়ে স্যারেরও মাঝেমাঝে হাসি চলে আসে। কি ওকওয়ার্ড অবস্থা। বছর ঘুরলো, প্রথম প্রফ পার করলাম। ভাবলাম এবার বুঝি সাইকির স্যার গেলেন নেটওয়ার্কের বাইরে।

বিধি বাম। ৩য় বর্ষে আমরা ক্লাস আর ওয়ার্ড শুরু করতে না করতেই কলেজে সাইকিয়াট্রি বিভাগ খুলে দেয়া হল। একমাত্র এসিসটেন্ট প্রফেসর হিসাবে স্যারেরই পদোন্নতি হল সেই বিভাগে। ক্লিনিকাল স্টুডেন্টদের সাইকিয়াট্রি বিভাগে প্লেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হল। কি যন্ত্রণা, এবার ঠিকই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাগলের চিকিৎসা নিয়ে শিখতে হবে!




ওয়ার্ডে কি সব অদ্ভুত সব রোগী, কথাবার্তা লাগাম ছাড়া। ৭ দিনের প্লেসমেন্ট ফাঁকিবাজি করে ২/৩দিন না গিয়ে কাটিয়ে দিলাম। স্যার আগ্রহ করে কথা বলতে গেলেই আমরা গল্পগুজব করে পাস কাটিয়ে যেতাম। পুরানো ছাত্র বলে স্যারও বেশী কঠিন হতে পারতেন না।

চতুর্থ বর্ষের প্লেসমেন্টে কোন সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ড না পড়লেও সপ্তাহ দুয়েক পরপর কোন একদিন সাইকিয়াট্রি লেকচার ক্লাস পড়তো। ঘুমঘুম চোখে লেকচার শুনতে গিয়ে সবারই মনে হতো আমার কোন মানসিক রোগ আছে। কারো মনে হতো বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, কারো ডিপ্রেশন, কারোবা এন্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার।

ফাইনাল ইয়ারের সময়টা কেটে গেলো ধুমধাম করে। প্রফের আগে এসেসমেন্টের আগে শুনি মেডিসিনের সাইকিয়াট্রির ভাইবা বোর্ড থাকবে আলাদা। হায় হায়, প্রফের সময় একবারই পড়বো এই সাবজেক্ট ভেবে এটা কবেই রেখে দিয়েছিলাম বাকি বইয়ের তলায়। অল্প সময়ে মেডিসিনের একগাদা পড়ার ফাঁকে কোনমতে ঘণ্টা দুয়েক চোখ বুলালাম এন্ডেভার আর লেকচারের পাতায়, বিশাল সিলেবাস। শেষ হবে না ভেবে হাল ছেড়ে দিলাম প্রায়। ভাইবার হলে পুরনো সেই স্যার দেখি সিজোফ্রেনিয়ার এ বি সি ডি (Auditory Hallucination, Broadcasting of Thought, Controlled Thought, Delusion) পারতেই খুশী। এক স্যার, যাকে আমরা প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত ফেইস করে গেলাম।

ইন্টার্নীতে প্রথম সাইকিয়াট্রির প্রকোপটা অনুভব করলাম। এমিট্রিপটাইলিন, ক্লোনাজিপাম, ফ্লুপেন্টিক্সল+মেলিট্রাসিন ছাড়া কোন প্রেসক্রিপশন যেন সম্পূর্ণ হয় না, সেটা শুধু মেডিসিন স্পেশালিষ্টদের বেলাতেই। সাইকিয়াট্রির প্লেসমেন্টে আরও ট্রিটমেন্টের তো শেষ নাই। একটাই অনুধাবন হল, এদেশের মানুষ যত না শরীরের সমস্যায় ভোগে, তার থেকেও বেশী ভোগে মনের সমস্যায়। অভিজ্ঞতা থেকেই বলা, ডাক্তাররাও এর ব্যতিক্রম নয়।

সাইকিয়াট্রিস্টের কাজটা আমাদের দেশে খুব অমর্যাদাকর হিসাবে রয়ে গেছে অনেকের মনেই। আমেরিকায় বেতনের দিক থেকে ৩য় স্থানে থাকা এই জব হোল্ডারদের সমতুল্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে পরিচিত হন পাগলের ডাক্তার হিসাবে। তবুও দিন বদল চলছে, মানুষ এখন বুঝতে শিখছে। আমরাও এনাটমির সাইকিয়াট্রির হাসিঠাট্টার পর্যায় থেকে বুঝতে শিখে এর গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পারছি।

১০ অক্টোবর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। পরিবারে একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত সদস্য থাকলেই শুধু আমরা এর গুরুত্বটা অনুধাবন করতে পারি। নিজের ভিতরেও যে কতো সমস্যাগুলোর বীজ বহন করে চলছি তা গোপনই থেকে যায়। শরীরের স্বাস্থ্যের সাথে মনের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হই, এই কামনায়...