০৮ আগস্ট, ২০১৪

প্রেক্ষাপটঃ ইবোলা ভাইরাস এবং বাংলাদেশ

গল্পের নায়ক জোনাথন হারকার, পটভূমি ট্রান্সেলভেনিয়ার কারপেন্থিয়ান পর্বতমালা, গল্পের ভিলেন কাউন্ট ড্রাকুলা। কিছু শব্দেই ভেসে উঠে ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলার গল্পের কথা। একশোরও বেশী বছর আগের লেখা এই গল্প অনুদিত হয়েছে বহু ভাষায়, এর ছায়া অবলম্বনেই লিখা হয়েছে শখানেক নাটক, বানানো কয়েক ডজন টিভি সিরিয়াল আর মুভি। হাল সময়ের মেয়েদের প্রিয় “ভ্যাম্পায়ারস ডায়রিস” ড্রাকুলা কাহিনীকে রোমান্টিকনেসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ড্রাকুলা কাহিনীর বিবর্তন কোথায় গিয়ে থামবে বলা কঠিন। ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ার শব্দগুলো শুনলেই ভেসে উঠে কোন রক্তচোষা জীবের নাম, যে মানুষের রক্তপানে জীবনধারণ করে অভিশপ্ত জীবনের বীজবহন করে নিরীহ মানুষের মাঝে সেটা ছড়িয়ে বেড়ায়।


কোন গল্পের পুরোটা কখনো মিথ্যে হয় না। ভ্যাম্পায়ার বেট/বাদুড় সত্যিকারের কোন জীব একথা প্রথম জানতে পারি ন্যাশনাল জিওগ্রাম্ফির পর্দায়। ছোট ছোট বাদুড় যারা বেচেই থাকে অন্য প্রাণীদের রক্তপান করে, মানুষও তাদের খাবারের তালিকা থেকে বাদ যায়না। অস্ট্রেলিয়া সহ আরও বেশ কিছু দেশে অসতর্ক সমুদ্রপ্রেমিক ক্যাম্পারদের প্রায়ই শিকার হতে হয় এসব বাদুড়ের, অনেকটা আমাদের দেশের মশার মতো। অনেকক্ষেত্রেই বাদুড়ের কামড়ের এসব ভিকটিমদের বড় কোন ক্ষতি হয়ে উঠে না। আবার অনেকসময় ড্রাকুলা কাহিনীর মতোই এরা ছড়িয়ে দিয়ে যায় কিছু অভিশপ্ত বীজ। নিপাহ, ইবোলা, সারস এরা বাদুড়ের কিছু অভিশপ্ত বীজের নাম।
খুব বেশী দিন আগের কথা না, ২০১১ সাল দেশের উত্তরবঙ্গের কথা। শীতের সকালে খেজুরের রস খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লো বেশ কিছু লোক। দ্রুত তাদের স্থানান্তরিত করা হয় নিকটস্থ হাসপাতালে। রোগ ধরার আগেই জ্বর, গায়ে ব্যথা আর ব্রেন ইনফেকশনের লক্ষন নিয়ে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়। শেষমেষ সংক্রামক রোগের বিশেষ বিভাগের সহায়তায় রোগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় নিপাহ ভাইরাস ইনফেকশন। নিপাহ ভাইরাস এদেশে এর আগে কখনই পাওয়া যায়নি, তবে কিভাবে হটাৎ করে বাংলাদেশে এই রোগ? কারন খুজতে গিয়ে এই থিওরিই খুঁজে পাওয়া হয় যে দেশের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা বাদুড় যারা ফলের রস খেয়ে বেচে থাকে তারা বয়ে নিয়ে এসেছিলো এই রোগ। খেজুর গাছের রস খাবার সময় তাদের থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে খেজুরের রসে এবং শেষমেশ স্থান হয় গাছগুলো থেকে খেজুরের রস খাওয়া মানুষগুলোর শরীরে। এরপর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে। (সূত্রঃ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ)
বর্তমানের উত্তর আফ্রিকার আরেক আতঙ্কের নাম ইবোলা ভাইরাস। এরও বহনকারী জীবগুলোর মাঝে অন্যতম একপ্রজাতির ফলখেকো বাদুড়। নানান ভাবে এই ভাইরাস স্থানান্তরিত হয় বাদুড় সহ আরও কিছু প্রাণীর দেহ থেকে মানবদেহে। সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মতো শুরু হয়ে শেষ পর্যায়ে রক্তের প্লেটলেটের পরিমান কমিয়ে দেহের নানান স্থান থেকে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তপাতের মাধ্যমে এটি আসলেই মানুষকে রূপ দেয় ড্রাকুলাগল্পের ভিক্টিমগুলোর মতো রক্তক্ষয়ী রুপে। একবার খারাপ পর্যায়ে চলে গেলে এতে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি। এটুকুই আশার ব্যাপার হল এই রোগ হাঁচিকাশি বা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না, শুধুমাত্র দেহের কোন সিক্রেসন যেমন থুথু, ঘাম বা চোখের পানি, বমি অথবা রক্ত এগুলোর স্পর্শে এই রোগ এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের দেহে ছড়ায়। আফ্রিকার যেসব দেশে (সিয়েয়া লিয়ন, জাম্বিয়া) এসব রোগ প্রতিনিয়ত হচ্ছে, দেশগুলোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নিযুক্ত আছে সেনাবাহিনীর অনেক বাঙ্গালী ভাইয়েরা। এখন আসলেই মনে প্রশ্ন জাগবে আমাদের দেশের মানুষ বা কতোটুকু নিরাপদ।
খুব সম্প্রতি সিয়েরা লিয়নের অন্যতম ডাক্তার ডাঃ শেখ উমর খান যিনি দেশের ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছিলেন, তিনি নিজেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁকে তার এই অবদানের কথা স্মরণ রেখে জাতীয় বীরের উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। যেকোনো সংক্রামক রোগের ঝুকির মাঝে সবচেয়ে বেশীই থাকেন একজন ডাক্তার, একজন মেডিকেল ছাত্র, একজন নার্স। কতো রোগীকে আমরা কিছু না জেনেই, উপযুক্ত প্রস্তুতি না নিয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। সচেতনতার কোন বিকল্প তাই তাদের জন্য হয় না।

মাঝেমাঝে নিজের কাছেই অবাক লাগে, এতো বিচিত্র রোগের মাঝে আমরা আসলে বেঁচে আছি কিভাবে? তখন উত্তর খুঁজে পাই ড্রাকুলা গল্পেরই এক প্রার্থনার মাঝে, “আমাদের এবং সকল অশুভ শক্তির মাঝে ঈশ্বর সর্বদা বিরাজমান”।।

০৪ আগস্ট, ২০১৪

হারানো বন্ধুর থিয়োরি - কিছু অনুচ্চারিত বন্ধুর স্মরণে

The lost friend’s theory (হারানো বন্ধুর থিয়োরি) এর আরেক নাম হাইজিন হাইপোথিসিস। ছোটবেলা থেকে হাঁচির এলারজির প্রবল সমস্যা থাকায় এলারজির পিছনে কি কি ফ্যাক্টর দায়ী সেটা জানা নিয়ে উৎসুক ছিলাম বরাবরই। হাইজিন হাইপোথিসিস শব্দটা প্রথম জানতে পারি মেডিকেল ড্রামা “হাউস এমডি” দেখতে গিয়ে। শুনতে অনেক কঠিন শুনালেও মানেটা অনেক সোজা। একজন মানুষ বাচ্চাকালে যতবেশী পরিষ্কার থাকবে, তার রোগ হবার সম্ভাবনা ততবেশী। কথাটা শুনতে উলটো শুনায়? কতখানি ঠিক এই তথ্য? 


হারানো বন্ধুর থিয়োরিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জীবাণুগুলো আমাদের হারানো বন্ধু। বিবর্তনের একেবারে শুরু থেকে মানুষ যখন বদলাতে শুরু করলো তখন সে একা বিবর্তিত হতে পারেনি, তার বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে রোগের জীবাণুগুলো। মানবদেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা এই জীবাণুদের দান। এক সদ্যোজাত শিশু যখন বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে আসে তখন তার দেহে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা প্রায় থাকেনা বললেই চলে। স্রষ্টার অশেষ কৃপাতে প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ তাকে পরোক্ষ ভাবে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু এই ছয় মাস জীবনের আরেক বন্ধু হল এই জীবাণুগুলো। জীবাণুগুলো দুর্বল ভেবে বাচ্চাকে আক্রমন করে পরে অবাক হয়ে যায় তার পরোক্ষ ভাবে পাওয়া এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেখে। যুদ্ধে হেরে পরাজয়ের পর পলায়নের সময় সে বাচ্চার নিজের দেহের প্রহরী রোগী প্রতিরোধের ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো কোষগুলোতে রেখে যায় নিজের ছাপ। ঠিক ছয়মাস পর মায়ের বুকের দুধের এই রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতাটা চলে যায়। তারপরেও, বহুদিন পার হয়ে যাবার পরেও যখন রোগের জীবাণু আবার আক্রমন করে দেহকে, চেনা শত্রুকে দেহের শিক্ষিত প্রহরীরা চিনে নেয় এক মুহূর্তেই। এই কারনে ছোটবেলার এসব ছোটখাটো সর্দিজ্বরকে প্রয়োজনীয় ধরে নিয়ে এদেরকে মানুষের বন্ধু বলে ধরে নেয়া হয়। প্রায় একই কথা দাড়ায় ডাস্ট, পোলেন আরও নানা এলারজির জন্য। যারা খুব ছোটবেলাতে গ্রামের ধুলোবালি, পরাগরেনু, পশুপাখির সংস্পর্শে থেকে বড় হয়েছে তাদের বড় হয়ে এসব এলারজির সমস্যা প্রায় থাকেই না বলে দেখা গেছে।
কিন্তু যুগের বিবর্তনে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আমরা এখন দিনদিন এসব রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছি। বাচ্চাকে প্রতিদিন এন্টিসেপ্টিক সাবানে গোসল করানো থেকে শুরু করে ধুলোবালির ছিটেফোঁটাবিহীন ঘরে রাখা, একটু অসুস্থ হলেই এন্টিবায়টিক গুলে খাওয়ানো আর কৌটাজাত দুধ খাওয়ানোর কারনে ছোটবেলায় যেসব রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনায়শে পেয়ে যাওয়ার কথা সেগুলোতে এযুগের বাচ্চারা ঘাটতিতে থেকে বড় হচ্ছে। দেহের প্রহরীরা বড় বেলায় বেয়াড়া স্বভাবের হয়ে যায়, বাইরের রোগের জীবাণুকে এরা তখন চেনার আগ্রহটুকু বোধ করে না। উলটো ঝামেলা বাধায় নিজের দেহের নিরীহ কোষগুলোর সাথে। এই কারনে প্রতিনিয়ত নিজের দেহের বিপরীতে নিজের ইউমিন সিস্টেম দিয়ে হওয়া রোগগুলো বাড়ছে। SLE, Acute Lymphoblastic Leukemia, Arthritis, Type 1 DM, Myasthenia Gravis এসব বিধঘুটে নামের রোগ যা নিজের দেহের অশিক্ষিত প্রহরী কোষ দিয়েই হয়, এসব রোগর নাম এতো ঘনঘন শোনা যাচ্ছে। আমাদের দেশ তাও এসব রোগে অনেক পিছিয়ে। উন্নত দেশগুলো যেখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় বেশী এগিয়ে, সেখানে ক্যান্সারের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর অনেক কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো যদি হয়তো বাচ্চাটা ছোটবেলায় একটু অসুখে ভুগত। হাইজিন হায়পোথিসিস বা লস্ট ফ্রেন্ডস থিয়োরি একে এমন ভাবেই ব্যাখ্যা করে।
আজকে বন্ধু দিবসের সাথে সাথে পহেলা আগস্ট থেকে আগামী সাত আগস্ট পর্যন্ত চলছে World Breast Feeding Week। এই দুইয়ের সঠিক প্রয়োগে হয়তো আগামী প্রজন্মকে কিছু আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এক মনিষী বলেছিলেন, “পৃথিবীতে যদি কোন ধুলাবালি না থাকতো, তবে মানুষ হাজার বছর বাঁচত।” কিন্তু বাস্তবে ধুলাবালি আর রোগজীবাণুর বন্ধুত্বপূর্ণ অবদানটাকেও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

০১ জুলাই, ২০১৪

ডায়গনোসিস

কোন এক মঙ্গলবার, জানুয়ারি মাস চলছে তখন। মাস খানেক হয়েছে ইন্টার্ন হিসাবে মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্টের। ফিমেইল এডমিশন টেবিলে বসে আছি। এডমিশন চলছে, পেসেন্টের অপেক্ষা। সকালবেলার একটা সময়ে পেসেন্ট আসার একটা রাশ আওয়ার থাকে, হুড়মুড় করে পেসেন্ট আসতে থাকে। ঐ দিন সময়টা বেশ নিরবেই কাটছিল। হটাত এক রোগিণীর আগমন। মধ্যবয়স্ক মহিলা, সাথে মেয়ের বয়সী আরেকজন। এক্সামিনেসন টেবিলে শুতে বলে রোগীর হিস্ট্রি নিতে গেলাম। মহিলা নিজে কোন কথাই বলতে চান না, সাথের জন আবার কথা বলা শুরু করলে থামতেই চায় না। ধমক দিয়ে মহিলাকে নিজের সমস্যা নিজেই বলতে বললাম, তার ভাষ্য অনুযায়ী সপ্তাহখানিক আগে জ্বর আর হাতের জোড়ায় ব্যথার কারনে গ্রামের এক ডাক্তারকে দেখান তিনি। ডাক্তার দেখে কিছু ওষুধ দেয়ার পর সেটা খাবার পর জ্বর কমে গেছে, কিন্তু মুখে আর হাতের উপর গুটিগুটি কতোগুলো আর মুখের ভিতরে ঘা। “ফিভার উইথ র‍্যাশ” আর “এডভারস ড্রাগ রিএকশন” দুটোকে মাথায় রেখে আরও কিছু প্রশ্ন করলাম, মহিলা কোন উত্তর সোজা ভাবে দিতে চায় না। মুখ দিয়ে কখনো রক্ত গেছে কিনা, কখনো পক্স হয়েছে কিনা আর কোন সমস্যা আছে কিনা এসব প্রশ্নের জবাবে একবার হাঁ বলে, আরেকবার না বলে। হিস্ট্রি শেষ করে ক্লিনিকাল এক্সামিনেসন করতে গিয়ে বিপি মাপতে গিয়ে দেখি প্রেসার ৬০/৪০। নার্সকে দ্রুত আইভি কেনুলা করতে বলে সাথের পুরুষ এটেনড্যান্সকে পাঠালাম আনুশাঙ্গিক জিনিসপত্র আনতে। কথা বলে জানতে পারলাম প্রায় ২ দিন ধরে তার কিছু খেতে ভালো লাগে না, এই কারনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। এদিকে সিস্টার দ্বিধাবোধ করছে, গুটিগুটি দাগ গুলো কিসের না কি, সংক্রামক না আবার। ভাল করে তাকালাম এতক্ষনে মহিলার চেহারার দিকে, দাগগুলোকে টিপিকাল চিকেনপক্সের দাগ বলা যাবে না, কি ডেসক্রিপসন হতে পারে নিজেই বুঝতে পারছি না, একটু পর এসেই স্যার জিজ্ঞেশ করবেন ডেসক্রাইব ইওর কেইস। ম্যাকুলো-প্যাপুলার লেইসন বলেই ডেসক্রাইব করব ভাবলাম, তারপর মুখের ভিতরে ঘা আর জ্বরের জন্য প্রবাব্লি এন্টিবায়োটিক ইনটেকের হিস্ট্রি আছে বলে স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোমেই নিয়ে যাবার কথা চিন্তা করলাম। যেইখানেতে বাঘের ভয়, সেইখানেতেই সন্ধ্যা হয়। বলতে না বলতেই স্যার এসে হাজির। তাও একজন স্যার না, তিন তিন জন স্যার। অগোছালো ভাবে হিস্ট্রি প্রেস্নেন্ট করলাম, নিজের ডায়গনোসিস ও বললাম। স্যাররাও দেখলাম দাগটাকে নিয়ে একটু কনফিউসড। জ্বর আগে না দাগ আগে এই প্রশ্নের উত্তর মহিলা ঠিক ভাবে দিতে পারে না, আবার তার নাকি আগে থেকেই জোড়ায় ব্যথা মাঝেমাঝেই থাকে। এক স্যার হটাত জানতে চাইলেন, এখানে আসলেন কেন? তখন হটাত মহিলা বলে, গতকাল এক ডাক্তার দেখাইসি উনিই প্রেসক্রিপশনে লিখলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগবে। আমি মাঝ থেকে বজ্রাহত, এতক্ষন পর এই কথা বলতেসে মহিলা! সাথের বেশী কথা বলা মহিলাটা এতক্ষনে এনে সেই প্রেসক্রিপসন স্যারের কাছে দিল, উঁকিঝুঁকি মেরে দেখালাম আমাদের মেডিকেলেরই স্কিনভিডির বড় এক স্যার, স্যারের ডায়গনোসিসও স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোম। দেখে নিজের মাঝে একটা আত্মতৃপ্তির বোধ আসলো, যাক চিন্তা ভাবনার লাইনতো ঠিক আছে। স্যাররাও এডভারস ড্রাগ রিএকশন হিসাবে পেসেন্টকে ট্রিট করার সায় দিলেন। রোগিণীর চিকিৎসা হল, সকল এন্টিবায়োটিক বাদ দিয়ে জ্বরের জন্য নাপা সাপোসিটোরি, ফেক্সোফেনাডিন ১৮০গ্রাম, অরাল স্টেরয়েড (স্কিনের স্যারের পরামর্শে), রেনিটিডিন এবং প্রয়োজনে পারএন্টারাল নিউট্রেসন। পরদিন অন্যান্য রোগীদের মতো রোগিণীর রুটিন ইনভেসটিগেসনগুলো (CBC, Urine analysis, Serum Creatinine, RBS etc) হাসপাতালের ল্যাবে পাঠানো হল। রাতে রাউন্ডে গিয়ে যথারীতি প্রায় একই রকম রিপোর্ট দেখলাম সিবিসি নরমাল, ইএসআর একটু বেশী, ইউরিনে কিছু পাস সেল, নো প্রোটিন, নো কাস্ট এরকম রিপোর্ট, সরকারী হাসপাতালের রিপোর্ট যেমন হয়। এদিকে রোগীর লোক আমাদের কথায় গ্রামের ডাক্তার কি ওষুধ দিয়েছিল সেটা এসএমএস করে জোগাড় করেছে। এডভারস ড্রাগ রিএকশন করতে পারে এমন এন্টিবায়োটিক থাকায় আমরা আর ডায়গনোসিস পাল্টানোর কথা ভাবলাম না। ৪/৫ দিন গেলো, রোগীনির কিছুটা ভালো লাগছে। একেতো শীতের সময়, তার উপর হাসপাতালে কেউ থাকতে চায় না। রাউন্ড বা ফলোআপে রোগিণীর পাশে গেলেই তার এক কথা, ওষুধ লিখে ছুটি দিয়ে দিতে। পরে স্যার এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন যেতে চাইলে DOR (ডিসচার্জ অন রিকুয়েস্ট) লিখে ছুটি দিতে। রোগিণী খুশি মনে চলে গেলো, আমরাও ভুলে গেলাম ব্যাপারটা।



সপ্তাহ দুয়েক পর নন-এডমিশন দিনে এডমিশন টেবিলে বসে আছি। রোগিণী আবার হাজির, হাতে ছুটির কাগজটা। তার সিম্পটম আবার দেখা দিয়েছে, কোন কোন ওষুধ আবার খেতে হবে জানতে এসেছে। রোগীর অবস্থা দেখে রোগীকে আবার ভর্তি হতে বললাম, না সে ভর্তি হবে না। ভর্তির বাইরে আমরা কোন রোগীকে কিছু প্রেসক্রাইব করতে পারিনা বলে বহির্বিভাগে আরপির সাথে যোগাযোগ করতে বললাম। ভাবছিলাম আরপি হয়তো তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানাতে পারবে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেই গিয়ে যে সে কই হারিয়ে গেলো আর দেখা গেলো না।
এরও আরও কিছুদিন পর। রোগিণী আবার ভর্তি হল, অন্য একটা মেডিসিন ইউনিটে। এবার সাথে নতুন সিম্পটম, দুদিন ধরে প্রস্রাব প্রায় হয়ই না, রোগিণীর খুব অবস্থা খারাপ। জোড়ায় ব্যথা, মুখে ঘা আর কিডনির সমস্যা সবকিছুকে এক সাথে ফেলে নিগেটিভ সিম্পটমগুলোকে বাদ দিলে একটাই ডায়গনোসিস আসে, লুপাস নেফ্রাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস এরাইথোমেটোসাস (SLE) এর একটা খারাপ প্রেসেন্টেসন। ডায়গনোসিস নিশ্চিত করার জন্য এবার বাইরের ভালো ল্যাবে CBC, Unrine analysis, ANA, anti-ds DNA করার জন্য পাঠানো হল। দুর্ভাগ্য, এসব রিপোর্ট হাতে আসার আগেই রোগিণী মৃত্যুবরণ করেন।

কাজ করে উপলব্ধি একটাই, প্রায় সবসময়ই আপনি যা ভাববেন এটাই সত্যিকারের ডায়গনোসিস। কিছু রোগীর জন্য আপনি কোন ডায়গনোসিস খুঁজে পাবেন না। এরা দ্বার থেকে দ্বার ঘুরবে, কিছু ভালো হয়ে যাবে, কিছু খারাপ। কিন্তু ডায়গনোসিস (মিস-ডায়গনোসিস বলাই ভালো) করা কিছু রোগীর ভাগ্য খারাপের কারনেই হোক, রোগীর নিজের খামখেয়ালীপনার কারনেই হোক অথবা আমাদের কোন ভুলত্রুটির কারনেই হোক, খারাপ কিছু হবে। হয়তো এরকম রোগী ০.০১% এর ও কম। কিন্তু এরাই মনে ১০০% ছাপ রেখে যাবে।

This is why probably we doctors can’t afford to make any mistake, even have to correct the mistake that was not even there.