১৪ নভেম্বর, ২০১৭

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস, ২০১৭


২০১৩, ইন্টার্ন সবেমাত্র শুরু হয়েছে তখন। প্রথম প্লেসমেন্ট সার্জারি ওয়ার্ড দিয়ে শুরু। যে গভীর আগ্রহ নিয়ে ইন্টার্ন শুরু করছিলাম সার্জারি ওয়ার্ড দিয়ে, সপ্তাহ দুয়েক যাবার পরেই কিছু কারনে বুঝতে পারলাম আমি সার্জারি লাইনের মানুষ না।


একটু হতাশ লাগছিল, নিজের পছন্দের বিষয় ইন্টার্নীতে এসে পালটে যেতে দেখে। দিন যায়, রোগীর ফলো-আপ, ওটি এসিস্টেন্স, ইমারজেন্সি ডিউটি করে পার করে দিচ্ছিলাম সময়গুলিএকদিন হটাৎ করেই নিজের বেডে রুটিন কলিসিটেক্টমির (পিত্তথলীর অপারেসন) জন্য ভর্তি হলেন এক মধ্য বয়সী মহিলা। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের রোগী তিনি, ব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রনের বাইরে। অপারেশনের আগে ব্লাড সুগার কন্ট্রোলের দায়িত্ব পড়লো বেড ডাক্তার হিসাবে আমারইন্সুলিন শুরু করা হল, কিন্তু গ্লূকমিটারে ব্লাড সুগার দেখে সেই ইন্সুলিন বাড়ানো কমানোর সঠিক পন্থা সম্পর্কে সঠিক কোন গাইড পেলাম না সিনিয়রদের থেকে। মেডিসিনে রেফার জানানো হল তখন, স্যাররা এসে ইন্সুলিনের ডোজটা বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। রোগীর ব্লাড সুগার কিছুটা নিয়ন্ত্রনে এল, কিন্তু অপারেশনের পর আবার তা নিয়ন্ত্রনের বাইরে। তখন ধারনা হয়েছিল ডায়াবেটিস রোগীর ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রনের মতো কঠিন কাজ বুঝি আর হয় না।


সার্জারির শেষের দিকে এসে পরিচয় হল বারডেম (ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ) থেকেই পাস করে কুমিল্লা মেডিকেলের সার্জারি বিভাগে ট্রেনিং করতে আসা এক সিনিয়র অনারারী মেডিকেল অফিসার ভাইয়ের সাথে। ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতেই জানলাম ডায়াবেটিস বিষয়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির পরিচালিত “সিসিডি” নামের সার্টিফিকেট কোর্সের কথা। মনে রাখলাম, কখনো যদি সুযোগ হয় সেটা করে নিবো এই ভাবনায়। সার্জারি ওয়ার্ডে পরবর্তীতে আরও অনেক ডায়বেটিক ফুটের রোগী এবং তাদের জটিলতার অভিজ্ঞতা থেকে ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা অনেকখানি উপলব্ধি করলাম।


সার্জারির প্লেসমেন্ট শেষ হল, শুরু হল গাইনি প্লেসমেন্ট। সেখানেও ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতার শেষ নাই। প্রেগ্ননেন্সির শেষ পর্যায়ে এসে হটাৎ করেই বাচ্চা মারা যাওয়া থেকে শুরু করে সিজারিয়ান সেকশনের সেলাইয়ের ইনফেকশনের অভিজ্ঞতা থেকে ডায়াবেটিক রোগীর কমপ্লিকেসনের অভিজ্ঞতার তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ হল।


সবার শেষে এলো মেডিসিন প্লেসমেন্টপ্রতি এডমিশনে জটিল সমস্যা নিয়ে ভর্তি রোগীদের রক্তের ব্লাড সুগার পরিমাপ করলেই দেখা যেতো অধিকাংশ রোগীরই ডায়াবেটিস। এদের আবার অধিকাংশ রোগী জানেই না তার ডায়াবেটিস পূর্বে ছিল কি না। মেডিসিনের ইউনিট প্রধান শ্রদ্ধেয় স্যারের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা থেকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিয়ে আরও বিস্তারিত অনেক কিছু জানার সুযোগ হল। অবাক করে দেখালাম, ক্রনিক কমপ্লিকেসনে ভোগা রোগীগুলোর জন্য ডাক্তারদের আসলে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। যে দুই একটা সিম্পটমেটিক চিকিৎসা দেয়া হয় তা আসলেই রোগীর ভোগান্তি খুব একটা কমানোর সাধ্য রাখে না। তবুও উপলব্ধি করলাম, ডাক্তারদের হাতে যে সীমিত ক্ষমতা আছে রোগীর জন্য কিছু করার, তার মাঝে মুখ্য একটি বিষয় হল রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি হাতে গোনা দুই তিন জন রোগী বাদ দিয়ে কারো ডায়াবেটিসের আদর্শ নিয়ন্ত্রন বা শিক্ষা দেয়ার সুযোগ হয়ে উঠেনি তখন।


ইন্টার্ন শেষ হল, ঢাকা আসলাম বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লিট করতে। তখনই এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম পরবর্তী সেশনের সিসিডি কোর্সের জন্য অনলাইনে এপ্লিকেশন জমা নিচ্ছে সেই সময়। বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন হাতে পেয়েই অনলাইনে এপ্লিকেশন ফর্মটা ফিল-আপ করলাম সিলেটকে রিজিয়নাল ট্রেনিং সেন্টার হিসাবে দিয়ে। সিনিয়রিটির ভিত্তিতে এপ্লিকেশন ফর্ম এলাও করে এটা শুনে ধরেই নিয়েছিলাম হবে না। কয়েক দিন পর অবাক করেই দেখলাম, মোবাইলে ভর্তির জন্য মেসেজ। ভর্তি হতে গিয়ে জানলাম, রিজিওনাল ট্রেনিং সেন্টার “সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতাল”।


ইন্টার্ন শেষ করে সিলেট চলে আসলাম কুমিল্লা থেকে। জুলাই থেকে সিসিডির ক্লাস শুরু। সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতালে ক্লাস সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম সেখানে মেডিকেল অফিসারের জন্য ডাক্তার খোজা হচ্ছে। ৩৩তম বিসিএসের নিয়োগ হয়েছে তখন মাত্র। বেসরকারি পর্যায়ে তখন প্রবল ডাক্তারের স্বল্পতা। ক্লিনিকের বেশ ভালো অঙ্কের বেতনের চাকরিকে উপেক্ষা করে সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতালের সীমিত অঙ্কের বেতনে মেডিকেল অফিসার হিসাবে যোগদান করলাম এই ভেবে, যে সিসিডির পুথিগত বিদ্যার সাথে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় অন্তত হবে।


সিসিডির ৬ মাসের সময়খানি পার করেও সর্বমোট ২ বছর ডায়াবেটিক হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ হল। তাক্তিক জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করে কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি হল, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা প্রতিটি রোগীর জন্য কতখানি ভিন্নতা নিয়ে করতে হয়। এক দাঁড়িপাল্লা দিয়ে সবার সমস্যার পরিমাপ আর সমাধান করা যায় না। আরও উপলব্ধি করলাম, চিকিৎসা রোগীর জন্য কতখানি গুরুত্ব বহন করে। আজকের সঠিক চিকিৎসা রোগীর আগামী দিনের শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক কষ্ট কতোখানি কমিয়ে দেয়। ক্রমাগত লেগে থাকা শারীরিক সমস্যার সমাধানের আদর্শ কোন পথ বা চিকিৎসা না পাওয়া গেলেও ডাক্তারের সীমিত সাধ্যের মাঝে যেটুকু রোগীর জন্য উপকার করে দেয়া সম্ভব সেখানে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কতো খানি গুরুত্ব বহন করে সেটা কখনোই ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়, এই অভিজ্ঞতার অর্জন তখনই


জুলাই ২০১৬ তে বারডেমে আসার সুযোগ হল, এন্ডোক্রাইন বিভাগেরই ছাত্র হিসাবে। বারবারই মনে হয়, মেডিসিন ফ্যাকাল্টির এমন একটি বিভাগের সাথে সংযুক্ত হবার সুযোগ হল যেখানে রোগীকে রোগের, বিশেষ করে ডায়াবেটিসের প্রতিটি ধাপে প্রিভেনশন এবং চিকিৎসাসেবা দেয়ার সুযোগ রয়েছে, যা কিনা রোগীর ভোগান্তিকে বহুলাংশে কমিয়ে দিতে সক্ষম। ডাক্তার হিসাবে এর থেকে বড় অর্জন কখনোই কিছু হতে পারে না। ছাত্র হিসাবে এই বিভাগে এসে পরিচিত হবার সুযোগ হয়েছে কিছু শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের সাথে, যাঁদের সংস্পর্শে এসে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে ডাক্তার হিসাবে মানুষের প্রতি কতটুকু সংবেদনশীল এবং নিবেদিতপ্রান হওয়া সম্ভব। 




ডায়াবেটিস নিয়ে এতকিছু লিখার কারন একটাই। আজ ১৪ই নভেম্বর, “বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস”। চিকিৎসক, সাধারন মানুষ নির্বিশেষে আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং ডায়াবেটিস সম্পর্কে জ্ঞান এবং তা নিয়ন্ত্রনের প্রচেষ্টাই একমাত্র অদূর ভবিষ্যতে মহামারী আকারে ধারন করা এই সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম।


ডায়াবেটিস নিয়ে সকলের সচেতনতা বিস্তার হউক, এই কামনায়... 

৩১ আগস্ট, ২০১৭

Best Torrent Seeding Site: www.seedr.cc

These days torrent based websites has become the place for downloading freshly released videos, songs and books. But downloading from torrent comes with some regional legal restriction, as well as problem with installation of 3rd party downloading software and viruses and slow download speed.

For last one year, I'm using www.seedr.cc ; a great torrent seeding website where I can download the torrents and later can use my native download manager/web browser or even mobile to play and download videos and files. This is very friendly interface who also offers a lots of support for their free and premium accounts.


You can try them from here: https://www.seedr.cc/?r=297665
 

১৪ এপ্রিল, ২০১৫

শুভ নববর্ষ, ১৪২২

হেলা বৈশাখ, ১৪২০। ২০১৩ সালের পহেলা বৈশাখ। ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার রেজাল্ট এর কিছুদিন আগে দিয়েছে মাত্র। নব্যসৃষ্ট আমরা উৎসাহী ডাক্তাররা হাসপাতালে ইন্টার্নীতে নতুন বছরের আগেই শুরু করবো কিনা এই নিয়ে বিস্তর গবেষণার পর ঠিক হল, ১৭তম ব্যাচের ইন্টার্ন শুরু করার দিনটিও হবে ইংরেজি মাসের ১৭ তারিখ। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের আরও ৩ দিন পর। এই ৩ দিনের ছুটির সুযোগে বাসায় ঘুরে আসতে চলে গেলো ব্যাচম্যাট প্রায় সবাই। ক্যাম্পাসে রয়ে গেলাম আমরা অল্প কয়েকজন।

সেইবার ক্যাম্পাসে পহেলা বৈশাখ পালন করতে গিয়ে পরিচিত অপরিচিত মুখগুলোর ভিড়ে থেকেও নিজেদের তেমন উপস্থিতি না থাকায় যেন কিছুটা ঘাটতি রয়ে গেলো উৎসবের আনন্দে। তবে চোখের সামনেই দেখতে পেলাম মেডিকেল কলেজের ১৬তম ব্যাচের পহেলা বৈশাখের আনন্দকে। বিদায়ক্ষণে ক্যাম্পাসের শেষ পহেলা বৈশাখকে স্মৃতিতে জড়িয়ে রাখার প্রচেষ্টা।

এরপর দিন গেলো, মাস গেলো। ইন্টার্নীর সময়টা পার করে অনেক দ্রুতই যেন চলে এলো আরেক পহেলা বৈশাখ, ১৪২১। নতুন বছরের আগমনবানী মনে করিয়ে দিলো, আমাদেরও বিদায়ের সময় সন্নিকটে। তবে এবার ক্যাম্পাসের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে আমাদের ১৭তম ব্যাচের সকলেই উপস্থিত। সবার উপস্থিতিতে সম্ভবত ক্যাম্পাস জীবনের সবচেয়ে স্মৃতি বিজড়িত পহেলা বৈশাখ।




যেকোনো উৎসবে আনন্দের উৎস অনুষ্ঠানের উপকরণ, তথাকথিত আচারব্যবহার, গান এসব না যতটুকু, তার চাইতেও বেশী আনন্দের উৎস হয়ে দাড়ায় উৎসবের অংশ নেয়া মানুষগুলি। সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে চেনা পরিচিতির গণ্ডীর মাঝে থাকা কাছের এবং দূরের মানুষগুলো যখন একসাথে জড়ো হয়, তখন যে আনন্দের জন্ম নেয় তার কোন তুলনা হয়ে উঠে না।


পহেলা বৈশাখ আর ১৪২২ প্রিয়জনদের সাথে সকলের আনন্দে কাটুক, নতুন বছর সবার জন্য স্বপ্নপূরণের বার্তা নিয়ে আসুক, এই প্রত্যাশায়।।

২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অমর একুশের স্মরণে...

খুব ছোটবেলায় জাতীয় সরকারী ছুটির দিনগুলি কোনটা কিসের জন্য, সেটা মনে রাখতে বেশ হিমসিম খেতাম। সরকার বদলের সাথে সাথে ক্যালেন্ডারের কিছু ছুটির দিনের বদল হতো। তবুও যে কয়টি দিন কখনো ভুলে যাওয়া হয়নি এদের মাঝে একটি, একুশে ফেব্রুয়ারি।



স্কুলের ক্লাসের একটু উপরের দিকে উঠার পর থেকেই বাংলা রচনার কলামে প্রশ্ন আসতে লাগলো, একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা হাইকোর্ট, ভাষা আন্দোলন এমন কিছু শব্দ নিজের অজান্তেই মনে গেঁথে গেলো স্বর্ণাক্ষরে। আরও কিছু বছর পার হল। নতুন মেলেনিয়ামে ইউনিস্কোর সহযোগিতায় একুশে ফেব্রুয়ারি ততদিনে রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। বাংলা রচনার শিরোনামটা পাল্টে গেলো সেই সুবাদে। রচনার বর্ণনায় যুক্ত হল আরও কিছু তথ্যউপাত্ত। জানলাম ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে পৃথিবীর বুকে নাম করে নেয়া জাতি একমাত্র আমরাই।

গত কয়েকটা বছর ধরে বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই লেখাপড়া হয়ে উঠে বেশী। তারপরও কোথাও বাংলায় কিছু লিখতে পারার সুযোগ হলে, নিজের অজান্তেই মনে আনন্দ জাগে। হোক সেটা ফেসবুকে ওয়ালে অথবা প্রেসক্রিপশনের উপদেশের পাতায়। মা আর মাতৃভাষার বুঝি কোন তুলনা হয় না।

কয়েকদিন আগে কারন ছাড়াই মনে প্রশ্ন এসেছিলো, আমি চাইলে পৃথিবীর ঠিক কতো শতাংশ লোকের সাথে কথা বলতে পারবো। অবাক হয়েই ভেবে দেখলাম, পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ ভাষা আমার মাতৃভাষা আর ইংরেজিকে যদি দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেই গণ্য করি তাহলে সব মিলিয়ে খুব কম হলেও অর্ধেকেরও বেশী লোকের সাথে অন্তত ভাবের আদানপ্রদান করা সম্ভব।

ঘুরেফিরে সবকিছুর পিছনে একটাই দিন। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। কিছু সংগ্রামী তরুণের দেখানো পথ ধরেই এতোদূর আসা। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা।

০৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

প্রসঙ্গঃ বাংলাদেশের রোগীদের বিদেশপ্রীতি

চিকিৎসাক্ষেত্রে বাঙ্গালীর বিদেশপ্রীতি দেখে প্রথমদিকে খানিকটা বিরক্তই হতাম। এখন একটু হতাশাগ্রস্ত হই। এদেশের মানুষের মুক্ত চিন্তাভাবনার অভাব দেখে। রবি ঠাকুরের কবিতা, “বহুদিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যায় করি, বহু দেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে শুধু দু'পা ফেলিয়া, একটা ধানের শীষের উপর, একটি শিশির বিন্দু!” বিদেশথেকে আগত রোগীদের চিকিৎসার বর্ণনা এবং প্রেসক্রিপশনগুলো প্রায়শই এই কবিতাটাই মনে করিয়ে দেয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ছোটখাট কিছু উদাহরণ…


১) ২০ বছর বয়সী এক প্রবাসী যুবক দুবাইয়ে কর্মরত অবস্থায় হটাৎ পেটে ব্যাথা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হবার পরে দিন দুয়েক পর তার রোগ ডায়গ্নোসিস করা হল ডায়বেটিক কিটোএসিডোসিস। রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হল, ইনসুলিন দিয়ে। রোগী কিছুটা স্টেবল হওয়ার পর তাকে দ্রুত জানানো হল যে এই রোগের চিকিৎসার খরচ অনেক, দেশে ফিরে গিয়ে চিকিৎসা করালেই ভালো হবে। রোগী দেশে ফিরত আসলো, বাসায় আসার পথেই অর্ধসুস্থ রোগী আবার অনিয়মিত ইনসুলিনের কারনে আবার অসুস্থ হয়ে ডায়বেটিক হাসপাতালে ভর্তি হল। নিজের আগ্রহেই খোঁজ নিলাম, কেমন সেখানের চিকিৎসা ব্যবস্থা। সহজসরল ছেলেটার কথায় যা বুঝতে পারলাম, ঐখানে রোগীদের জন্য ডাক্তারের ভাগ আছে। এদেশের রোগীদের জন্য ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এসব দেশের ডাক্তার নির্ধারিত। চিকিৎসাখাতের ব্যয়ভারবহনের গ্যারান্টি না থাকলে বুঝিয়ে শুনিয়ে রোগীকে দেশে ফিরত পাঠানো হয়। ব্যবস্থাপত্রটাও খেয়াল করলাম। রেকর্ডকিপিং এর দিক থেকে সেটাকে দশে দশ দিতে পারলেও ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে আধুনিকগাইড লাইনের কোন কিছুই ফলো করা হয়নি। ডায়বেটিক কিটোএসিডোসিসের মতো মেডিকেল ইমারজেন্সিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে ইনসুলিন ৩০/৭০ (শর্ট একটিং + ইন্টারমিডিয়েট একটিং ইনসুলিনের মিক্সচার) দিয়ে। ডিসচার্জের কন্ডিসনে পেসেন্টকে দেখানো হয়েছে স্টেবল। আবার পেসেন্টকে দুটো ইনসুলিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে মুখে বলা হয়েছে খরচ বেশী দেখে বাসায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে। আমাদের গরীব দেশেও ডায়বেটিক কিটোএসিডোসিসের ট্রিটমেন্টের জন্য ইনসুলিন – আর (শর্ট এক্টিং ইনসুলিন) ব্যবহার করা হয়, যার দাম পড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। বিদেশে যদি এই চিকিৎসার জন্যই খরচ বেশী হবে বলে দেশে পেসেন্টকে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তখন স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞবোধ করি যে মেডিকেল লাইনের ভালোমন্দ, সত্যমিথ্যে বোঝার মতো ক্ষমতাটা কিছুটা হলেও অন্তত তিনি দিয়েছেন।


২) ক্রনিক কিডনি ডিজিসের এক রোগী এসে ডাক্তাররুমে খোঁজ নিচ্ছেন ডায়ালাইসিসের খরচ কেমন পড়বে। বেশ সামান্য অঙ্কের দাম শুনে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন মেশিন ভালো কাজ করে কিনা। এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে একটু বিপাকে পড়লাম। বললাম সবার জন্যতো ভালোই কাজ করে, আপনারও হয়ে যাবে আশা করি। রোগীর সাথে আসা পাশেই দাঁড়ানো আরেক বিজ্ঞ ভদ্রলোক মাঝখান থেকে কথা বলা শুরু করলেন, “আরে আমিতো দেড়লাখ টাকা খরচ করে ইন্ডিয়া থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসলাম, ঐ চিকিৎসার সাথে এখানের চিকিৎসার তুলনা হবে নাকি আবার!” একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম কি চিকিৎসা দিলো। ভদ্রলোকের উত্তরে যা বুঝতে পারলাম, সেরাম ক্রিয়েটিনিন ২.৫ মিগ্রা/ডেলি এর কাছাকাছি থাকায় ইন্ডিয়ার কোন এক হাসপাতালে গিয়ে কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করিয়ে তিনি খুব ভালো চিকিৎসা পেয়েছেন। ডাক্তার তাকে উপদেশ দিয়েছেন পাতে অতিরিক্ত লবন না খেতে, মাছমাংস কম পরিমানে খেতে, প্রতিদিন ১.৫লিটারের বেশী পানি না পান করতে আর প্রেসার নিয়ন্ত্রনে রাখতে। এতে তিনি খুব উপকার পেয়েছেন। অবাক হলাম, হায়রে মানুষ। এই উপদেশগুলোর মূল্য দেড়লাখ টাকা! বিদায় জানানোর সময় রোগীকে বললাম ইন্ডিয়ার ডায়ালাইসিস মেশিনগুলো খুবই ভালো হবে। ভদ্রলোক আবারো একটু সন্দেহের চোখে তাকাতে তাকাতে বিদায় নিলেন।


৩) আজকে আরেক রোগী ভর্তি দেয়ার সুযোগ হল। ডায়বেটিক + হাইপারটেন্সিভ + ওল্ড এম.আই (পুরানো হার্ট এটাক) রোগী হাইপোগ্লাইসেমিয়া (সুগার কমে যাওয়া) নিয়ে ভর্তি হয়েছে। রোগীর সাথে জনাপাঁচেক এটেনন্ডেন্ট, সবাই স্যুটেড বুটেড। রোগীকে নিয়ে এসেই সামান্য পরেই প্রশ্ন, ওয়ার্ডের বেডের চার্জ কতো আর কেবিনের ভাড়া কতো। শুনে তারা ডিসিশন দিলেন রোগীকে ওয়ার্ডে রাখা হবে। রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়ার (২.৪মিমোল/লি) প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে বেডে পাঠিয়ে সিস্টারকে মৌখিক অর্ডার দিয়ে রোগীর চলতি ব্যবস্থাপত্রের দিকে তাকালাম। ইন্ডিয়ার ভ্যালোরের এক মেডিকেল কলেজের একটি মেডিসিন ইউনিট থেকে ইস্যু করা হয়েছে। যথারীতি, হিস্ট্রির আর এক্সামিন্সন ফাইন্ডিংস, রিপোর্ট খুব সুন্দর করে লেখা হয়েছে। মনোযোগ দিয়ে পড়ছি দেখে পাশে দাঁড়ানো রোগীর এটেনডেন্স বলল, ওইখানের চিকিৎসাব্যবস্থা খুব ভালো। ডাক্তার ঘণ্টায় ঘণ্টায় এসে খোঁজ নিয়ে যায় রোগী কেমন আছে। রোগীর ডায়বেটিস দুই দিনে কমিয়ে দিয়েছে। হু, হু করতে করতে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে প্রেস্ক্রিপসনের পাতায় গেলাম। রোগীর ডায়বেটিসের চিকিৎসা দেখে মুখ হাঁ হয়ে গেল। ট্যাবলেট মেটফরমিন (৫০০মিগ্রা) ২+২+২ – প্রতিদিন, ট্যাবলেট গ্লিপিজাইড ৫মিগ্রা ১+০+১ – প্রতিদিন, আবার সাথে ইনজেকশন ইনসুলিন (৩০/৭০) ১৪+০+১২ ইউনিট। এরই সাথে আরো বিভিন্ন ড্রাগের সাথে কার্ডিয়াক ড্রাগ হিসাবে হাই-ডোজে নন-সিলেক্টিভ বিটা-ব্লকার। ডাক্তারী লাইনের স্বল্পজ্ঞানের মাঝেই এসব অবাক হলাম। রোগী যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া নিয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়ে উঠেনি এটাই বরং আশ্চর্যের।

আরও আশ্চর্যের ভাবনা এলো, আমাদের দেশের কর্কশমুখের সস্তা ডাক্তারদের চিকিৎসা এড়াতে রোগীরাই লাখ টাকা খরচ করে বাইরে এই ধরনের চিকিৎসা নিতে বাইরে যান। দেশের বাইরের এই ধরনের চিকিৎসা আর ডাক্তারের বেশধারী কাউন্সিলারদের ঘণ্টায় ঘণ্টায় মিষ্টিকথায়ই রোগীরা খুশী!

“মিষ্টি কথায় চিঁড়া ভিজে না” - এই বাক্য এইদেশের কিছু রোগীদের জন্য পুরোটাই ভুল প্রমানিত।