১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মেডিক্যালীয় রহস্যঃ সিন্ড্রোম এক্স

ছোটবেলায় প্রতি শুক্রবারেই দেখতাম মামাতো ভাইদের গভীর আগ্রহে বিটিভিতে “The X-files” সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে। টিভি সিরিয়ালটা শুরু হতো বিটিভির রাতের খবরের পরে। অনেক আগ্রহ নিয়ে আমিও সারাদিন অপেক্ষা করে রাতের খবর দেখতে দেখতে কখন যে সিরিয়াল শুরু হবার আগেই ঘুমিয়ে পরতাম, বলতেও পারতাম না। পরদিন সকালে উঠে আফসোসের সীমা থাকতো না। মাঝেমাঝে দুই-একদিন বিরক্তির সীমা কাটিয়ে রাতের খবর পার করে সিরিয়ালের সময় পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে “The X-files” এর সূচনায় মিউজিকটা শুনেই একরকম শিহরণ জাগতো। প্রতি পর্বে রোমহর্ষক এক একটা রহস্য, সমাধানের বাইরে! “X” শব্দটাই যেন রহস্যময়।

The X-files এর হয়তো অনেকটাই কাল্পনিক। কিন্তু চিরকাল এই “X” শব্দটা মানুষকে রহস্যের স্বাদ দিয়ে গেছে। আমার চিরাচরিত মেডিকেল প্রসঙ্গ নিয়ে আসি, মেডিকেলের এমনই একটা অমীমাংসিত কেইসকে এখনো বলা হয় “Syndrome X”।

১৯৯৩ সালের ৮ই জানুয়ারিতে আমেরিকার বাল্টিমোরের মেরিল্যান্ডের জন্ম নেয় এক মেয়ে শিশু, নাম দেয়া হয় ব্রক গ্রীনবারগ (Brooke Greenberg)। জন্মের সময় পায়ের একটা হাড় কোমরের একটা জয়েণ্ট থেকে একটু আলাদা থাকা (হিপ ডিসলোকেশন) এই ছাড়া আর কোন সমস্যাই ছিল না তার। এই সমস্যা অপারেশন করে ঠিক করে দেয়া হয়, ব্রুককে স্বাভাবিক সুস্থ বাচ্চার মতোই দেখায় তখন।

এরপর ৬ বছর বয়সের মধ্যে তাকে একের পর এক মেডিকেলীয় সমস্যার মধ্য দিয়ে পার করতে হয়, একবার স্টোমাকে পারফরেসন (পাকস্থলীতে ফুটো হয়ে যাওয়া), একবার খিঁচুনি, একবার ব্রেন স্ট্রোক। এমনকি একবার ব্রেন টিউমার ডায়গ্নসিস হওয়ার পর কয়েকদিন পর টিউমারটি গায়েব হয়ে যায়।
একসময় হটাৎ করেই ব্রকের বাবা লক্ষ্য করেন যে মেয়ের বয়সের সাথে আর শরীরটা বাড়ছে না। ব্রকের ছোটবোন শারীরিক ভাবে বড় হয়ে ব্রককেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে! তার ধারণার সাথে ডাক্তাররাও প্রমাণ খুঁজে পান যে ব্রকের বয়স বাড়া হটাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রকের ক্রমোজম পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। সাধারণ মানুষের ক্রমোজমের সাথে তার ক্রমোজমের কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না তখন। এমনকি ক্রমোজমের যেসব অংশ বয়স নিয়ন্ত্রণ করে এবং বয়স সংক্রান্ত রোগ ঘটায় (যেমনঃ প্রজেরিয়া) এরকম এবনরমাল ডিএনএ বা কোনকিছুই পাওয়া যায়নি তার পুরো ডিএনএ সিকুন্যন্সিং করানোর পরেও।



ব্রকের সাথে জন্ম নেয়া ছেলে মেয়েরা স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে ঢুকে পড়ে, কিন্তু ব্রকের চেহারা, মানসিকতা এবং আচার আচরণ থেকে যায় ছোট বাচ্চার মতো। ১৬ বছর পার করা ব্রকের ব্রেইন পরীক্ষা করে দেখা যায় সেটা ছোট বাচ্চার ব্রেনের থেকে বেশী কিছুতে ডেভলাপ করেনি। তার মন ছিল ৮ থেকে ১২ মাস বয়সী বাচ্চার মতো। ব্রক বড় হতে থাকে তার ছোটবোনের কোলে। ব্রক ছোটবাচ্চাদের মতোই কথা বলতে পারতো না, শুধু মুখ দিয়ে কিছু শব্দ করতে পারতো। হাড় বা দাঁতগুলোও ছিল অপরিপক্ক। শুধু বাড়তো তার চুল আর নখটুকু। দেহের বিভিন্ন অংশের একেক রকম বাড়তে দেখে বিজ্ঞানীরা এখনো ধারনা করেন ব্রকের শরীরের একেকটা সেল ছিল একেক বয়সের। যেন একেকটা আলাদা আলাদা গাড়িতে করে চলা। একে ব্যাখ্যা করার মতো আজো উপযুক্ত কোন কারন খুঁজে পাননি তাঁরা। ব্রককে নিয়ে প্রচুর গবেষণা এবং ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়, ইচ্ছে হলে গুগুলে Brooke Greenberg লিখে একটু খুজলেই দেখতে পাবেন।

১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সাল, ২০টি বছর ছোট্ট বাচ্চা থাকার পরে যে হাসপাতালে ব্রক জন্ম নিয়েছিল ঠিক সেই হাসপাতালেই মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর কারনটা পারিবারিক ভাবে গোপন রাখা হয়। শুধু ব্রক না, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম আরও কিছু বাচ্চার প্রায় একই রকম কেস খুঁজে পাওয়া যায়। সবগুলোই এখন চলমান গবেষণার কেস। এখনো পর্যন্ত অমীমাংসিত এই রোগ (??) অথবা রহস্যের নাম দেয়া হয় “সিন্ড্রোম-এক্স”। এগুলোই বাস্তব জীবনের সত্যিকারের এক্স ফাইল।।