০৮ আগস্ট, ২০১৪

প্রেক্ষাপটঃ ইবোলা ভাইরাস এবং বাংলাদেশ

গল্পের নায়ক জোনাথন হারকার, পটভূমি ট্রান্সেলভেনিয়ার কারপেন্থিয়ান পর্বতমালা, গল্পের ভিলেন কাউন্ট ড্রাকুলা। কিছু শব্দেই ভেসে উঠে ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলার গল্পের কথা। একশোরও বেশী বছর আগের লেখা এই গল্প অনুদিত হয়েছে বহু ভাষায়, এর ছায়া অবলম্বনেই লিখা হয়েছে শখানেক নাটক, বানানো কয়েক ডজন টিভি সিরিয়াল আর মুভি। হাল সময়ের মেয়েদের প্রিয় “ভ্যাম্পায়ারস ডায়রিস” ড্রাকুলা কাহিনীকে রোমান্টিকনেসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ড্রাকুলা কাহিনীর বিবর্তন কোথায় গিয়ে থামবে বলা কঠিন। ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ার শব্দগুলো শুনলেই ভেসে উঠে কোন রক্তচোষা জীবের নাম, যে মানুষের রক্তপানে জীবনধারণ করে অভিশপ্ত জীবনের বীজবহন করে নিরীহ মানুষের মাঝে সেটা ছড়িয়ে বেড়ায়।


কোন গল্পের পুরোটা কখনো মিথ্যে হয় না। ভ্যাম্পায়ার বেট/বাদুড় সত্যিকারের কোন জীব একথা প্রথম জানতে পারি ন্যাশনাল জিওগ্রাম্ফির পর্দায়। ছোট ছোট বাদুড় যারা বেচেই থাকে অন্য প্রাণীদের রক্তপান করে, মানুষও তাদের খাবারের তালিকা থেকে বাদ যায়না। অস্ট্রেলিয়া সহ আরও বেশ কিছু দেশে অসতর্ক সমুদ্রপ্রেমিক ক্যাম্পারদের প্রায়ই শিকার হতে হয় এসব বাদুড়ের, অনেকটা আমাদের দেশের মশার মতো। অনেকক্ষেত্রেই বাদুড়ের কামড়ের এসব ভিকটিমদের বড় কোন ক্ষতি হয়ে উঠে না। আবার অনেকসময় ড্রাকুলা কাহিনীর মতোই এরা ছড়িয়ে দিয়ে যায় কিছু অভিশপ্ত বীজ। নিপাহ, ইবোলা, সারস এরা বাদুড়ের কিছু অভিশপ্ত বীজের নাম।
খুব বেশী দিন আগের কথা না, ২০১১ সাল দেশের উত্তরবঙ্গের কথা। শীতের সকালে খেজুরের রস খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লো বেশ কিছু লোক। দ্রুত তাদের স্থানান্তরিত করা হয় নিকটস্থ হাসপাতালে। রোগ ধরার আগেই জ্বর, গায়ে ব্যথা আর ব্রেন ইনফেকশনের লক্ষন নিয়ে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়। শেষমেষ সংক্রামক রোগের বিশেষ বিভাগের সহায়তায় রোগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় নিপাহ ভাইরাস ইনফেকশন। নিপাহ ভাইরাস এদেশে এর আগে কখনই পাওয়া যায়নি, তবে কিভাবে হটাৎ করে বাংলাদেশে এই রোগ? কারন খুজতে গিয়ে এই থিওরিই খুঁজে পাওয়া হয় যে দেশের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা বাদুড় যারা ফলের রস খেয়ে বেচে থাকে তারা বয়ে নিয়ে এসেছিলো এই রোগ। খেজুর গাছের রস খাবার সময় তাদের থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে খেজুরের রসে এবং শেষমেশ স্থান হয় গাছগুলো থেকে খেজুরের রস খাওয়া মানুষগুলোর শরীরে। এরপর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে। (সূত্রঃ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ)
বর্তমানের উত্তর আফ্রিকার আরেক আতঙ্কের নাম ইবোলা ভাইরাস। এরও বহনকারী জীবগুলোর মাঝে অন্যতম একপ্রজাতির ফলখেকো বাদুড়। নানান ভাবে এই ভাইরাস স্থানান্তরিত হয় বাদুড় সহ আরও কিছু প্রাণীর দেহ থেকে মানবদেহে। সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মতো শুরু হয়ে শেষ পর্যায়ে রক্তের প্লেটলেটের পরিমান কমিয়ে দেহের নানান স্থান থেকে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তপাতের মাধ্যমে এটি আসলেই মানুষকে রূপ দেয় ড্রাকুলাগল্পের ভিক্টিমগুলোর মতো রক্তক্ষয়ী রুপে। একবার খারাপ পর্যায়ে চলে গেলে এতে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি। এটুকুই আশার ব্যাপার হল এই রোগ হাঁচিকাশি বা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না, শুধুমাত্র দেহের কোন সিক্রেসন যেমন থুথু, ঘাম বা চোখের পানি, বমি অথবা রক্ত এগুলোর স্পর্শে এই রোগ এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের দেহে ছড়ায়। আফ্রিকার যেসব দেশে (সিয়েয়া লিয়ন, জাম্বিয়া) এসব রোগ প্রতিনিয়ত হচ্ছে, দেশগুলোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নিযুক্ত আছে সেনাবাহিনীর অনেক বাঙ্গালী ভাইয়েরা। এখন আসলেই মনে প্রশ্ন জাগবে আমাদের দেশের মানুষ বা কতোটুকু নিরাপদ।
খুব সম্প্রতি সিয়েরা লিয়নের অন্যতম ডাক্তার ডাঃ শেখ উমর খান যিনি দেশের ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছিলেন, তিনি নিজেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁকে তার এই অবদানের কথা স্মরণ রেখে জাতীয় বীরের উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। যেকোনো সংক্রামক রোগের ঝুকির মাঝে সবচেয়ে বেশীই থাকেন একজন ডাক্তার, একজন মেডিকেল ছাত্র, একজন নার্স। কতো রোগীকে আমরা কিছু না জেনেই, উপযুক্ত প্রস্তুতি না নিয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। সচেতনতার কোন বিকল্প তাই তাদের জন্য হয় না।

মাঝেমাঝে নিজের কাছেই অবাক লাগে, এতো বিচিত্র রোগের মাঝে আমরা আসলে বেঁচে আছি কিভাবে? তখন উত্তর খুঁজে পাই ড্রাকুলা গল্পেরই এক প্রার্থনার মাঝে, “আমাদের এবং সকল অশুভ শক্তির মাঝে ঈশ্বর সর্বদা বিরাজমান”।।