২৩ জুলাই, ২০১৪

ডাক্তার এবং কৃতজ্ঞতার কার্পণ্য

এক গরিব বালক স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়িতে বাড়িতে পণ্য বিক্রি করতো। একদিন সে খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঠিক করলো পরবর্তী বাড়িতে গিয়ে খাবার চাইবে। দরজার কড়া নাড়ার পর এক মেয়ে বেরিয়ে এল। সে হতভম্ব হয়ে খাবারের পরিবর্তে এক গ্লাস পানি চাইল। মেয়েটি ক্ষুধার্ত ছেলেটিকে দেখে পানির পরিবর্তে এক গ্লাস দুধ দিল। সে পরিপূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধপান করলো এবং বলল, আপনাকে কতো দাম দিতে হবে? মেয়েটি বলল, মা শিখিয়েছে ভালোবেসে কিছু দিলে দাম দিতে হয় না! ছেলেটি তখন তাকে ধন্যবাদ জানাল এবং মেয়েটির এই মহানুভবতা তাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী করলো। সে প্রতিদান দেয়ার জন্য মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। মহান স্রষ্টা ও মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অনেকগুন বেড়ে গেলো। সেদিনের সেই গরীব ছেলেটিই উনিশ শতকের আমেরিকার বিখ্যাত গাইনোকোলোজিস্ট Dr. Howard Kelly.


… সময়ের পরিক্রমায় সেদিনের সেই মেয়েটি, বয়সকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ডাক্তাররা শত চেষ্টা করেও সারিয়ে তুলতে পারেনি। তাকে আমেরিকার একটি বিখ্যাত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন জটিল রোগ নিয়ে গবেষণা করনে। Dr. Howard Kelly ওই হাসপাতালের একজন গাইনোকোলোজিস্ট ছিলেন এবং তাকে ভদ্রমহিলার চিকিৎসার দায়িত্ব দেয়া নয়। Dr. Howard Kelly যখন সেই রোগীর বিবরণ শুনছিলেন, তখন তাঁর পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি তিনি ওই রোগিণীকে দেখতে যান এবং চিনতে পারেন। চেম্বারে ফিরে এসে মনে মনে স্থির করেন, যেভাবেই হোক এই রোগীকে সারিয়ে তুলবেন। Dr. Howard Kelly, নিজের তক্তাবধানে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর, অবশেষে সেই রোগীর পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে সক্ষম হন। তিনি হিসাব শাখায় ভদ্রমহিলার চিকিৎসার বিলটি তাকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি বিলটি দেখে, চিকিৎসার সকল খরচ পরিশোধ করেন এবং বিলের নিচের অংশে কিছু লিখে রোগিণীর রুমে পাঠিয়ে দেন। প্রথমে সেই মহিলা বিল দেখে আঁতকে উঠেন এবং বুঝতে পারেন সারাজীবনেও এই বিল পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে কোনক্রমে সম্ভব নয়। পরে ভদ্রমহিলার চোখ বিলের নিচের অংশে যায়, সেখানে লেখা ছিল- “Paid in full with one glass of milk.”

এই গল্পটা ইংরেজি ভার্সন হয়তো অনেকেরই শোনা। হাতের কাছে পাওয়া একটা মেডিসিন কোম্পানির লিটারেচার থেকে হুবহু তুলে ধরলাম। গল্পটি প্রায় সত্যি। প্রায় সত্যি বলছি এই কারনে, Dr. Howard Kelly এর জীবনী যিনি লিখেছেন তার লিখায় তিনি বলেছেন, Dr. Howard Kelly কখনো এতো খারাপ অর্থনীতিক অবস্থায় ছিলেন না, যে তাকে কখনো বাড়ি বাড়ি গিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হতো। Dr. Howard Kelly নিজের ভাষায় গ্রীষ্মের দিনে পেনসিলভেনিয়ার হাইকিং করতে গিয়ে এক ফার্মহাউসে পাশে পেয়ে পিপাসা নিবারন করতে গিয়ে মেয়েটির সাথে দেখা। আর বৃদ্ধ অবস্থায় মেয়েটির কেস এমন কমপ্লিকেটেড কিছু ছিল না, Dr. Howard Kelly এমনিতেই প্রতি ৪ জন রোগীতে ১ জনকে ফ্রিতে দেখতেন। এটুকু বাদে বাকি ঘটনাটা সত্যিকারের। কিছু কাহিনী সবসময়ই একটু রঙমাখা, তবুও এমন ভালোবাসার গল্প শুনতে ভালোই লাগে অনেক। কিন্তু Dr. Howard Kelly এর মতো শত শত নাম না জানা ডাক্তার বাংলাদেশে রোগীর চিকিৎসাতে নিজের বিলটা না নিয়ে চেষ্টা করে যান মানুষকে কিছুটা ভালবাসা দিতে। এঁরা বড় হয়েছেন Dr. Howard Kelly এর থেকেও গরীব পরিবেশে, শিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়ছে তাদের। তাঁরা এমনকি বিল না নেয়ার বিনিময়ে রোগীর কাছথেকে এক গ্লাস দুধেরও আশা রাখেন নি। তবুও এই ডাক্তারদের বদনাম হয়, মধ্যসত্ত্বভোগী পরজীবীদের জন্য যারা পুরো স্বাস্থ্যসেবাটাকে একটা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছেন।

 ভাবতে ইচ্ছে হয়, হয়তো একদিন সকলের চোখ খুলবে। অন্ধকার পর্দার আড়ালে থাকা বাংলাদেশের Dr. Howard Kelly দেরকে এরা দেখতে শিখবে।।