০১ জুলাই, ২০১৪

ডায়গনোসিস

কোন এক মঙ্গলবার, জানুয়ারি মাস চলছে তখন। মাস খানেক হয়েছে ইন্টার্ন হিসাবে মেডিসিন ওয়ার্ডে প্লেসমেন্টের। ফিমেইল এডমিশন টেবিলে বসে আছি। এডমিশন চলছে, পেসেন্টের অপেক্ষা। সকালবেলার একটা সময়ে পেসেন্ট আসার একটা রাশ আওয়ার থাকে, হুড়মুড় করে পেসেন্ট আসতে থাকে। ঐ দিন সময়টা বেশ নিরবেই কাটছিল। হটাত এক রোগিণীর আগমন। মধ্যবয়স্ক মহিলা, সাথে মেয়ের বয়সী আরেকজন। এক্সামিনেসন টেবিলে শুতে বলে রোগীর হিস্ট্রি নিতে গেলাম। মহিলা নিজে কোন কথাই বলতে চান না, সাথের জন আবার কথা বলা শুরু করলে থামতেই চায় না। ধমক দিয়ে মহিলাকে নিজের সমস্যা নিজেই বলতে বললাম, তার ভাষ্য অনুযায়ী সপ্তাহখানিক আগে জ্বর আর হাতের জোড়ায় ব্যথার কারনে গ্রামের এক ডাক্তারকে দেখান তিনি। ডাক্তার দেখে কিছু ওষুধ দেয়ার পর সেটা খাবার পর জ্বর কমে গেছে, কিন্তু মুখে আর হাতের উপর গুটিগুটি কতোগুলো আর মুখের ভিতরে ঘা। “ফিভার উইথ র‍্যাশ” আর “এডভারস ড্রাগ রিএকশন” দুটোকে মাথায় রেখে আরও কিছু প্রশ্ন করলাম, মহিলা কোন উত্তর সোজা ভাবে দিতে চায় না। মুখ দিয়ে কখনো রক্ত গেছে কিনা, কখনো পক্স হয়েছে কিনা আর কোন সমস্যা আছে কিনা এসব প্রশ্নের জবাবে একবার হাঁ বলে, আরেকবার না বলে। হিস্ট্রি শেষ করে ক্লিনিকাল এক্সামিনেসন করতে গিয়ে বিপি মাপতে গিয়ে দেখি প্রেসার ৬০/৪০। নার্সকে দ্রুত আইভি কেনুলা করতে বলে সাথের পুরুষ এটেনড্যান্সকে পাঠালাম আনুশাঙ্গিক জিনিসপত্র আনতে। কথা বলে জানতে পারলাম প্রায় ২ দিন ধরে তার কিছু খেতে ভালো লাগে না, এই কারনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। এদিকে সিস্টার দ্বিধাবোধ করছে, গুটিগুটি দাগ গুলো কিসের না কি, সংক্রামক না আবার। ভাল করে তাকালাম এতক্ষনে মহিলার চেহারার দিকে, দাগগুলোকে টিপিকাল চিকেনপক্সের দাগ বলা যাবে না, কি ডেসক্রিপসন হতে পারে নিজেই বুঝতে পারছি না, একটু পর এসেই স্যার জিজ্ঞেশ করবেন ডেসক্রাইব ইওর কেইস। ম্যাকুলো-প্যাপুলার লেইসন বলেই ডেসক্রাইব করব ভাবলাম, তারপর মুখের ভিতরে ঘা আর জ্বরের জন্য প্রবাব্লি এন্টিবায়োটিক ইনটেকের হিস্ট্রি আছে বলে স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোমেই নিয়ে যাবার কথা চিন্তা করলাম। যেইখানেতে বাঘের ভয়, সেইখানেতেই সন্ধ্যা হয়। বলতে না বলতেই স্যার এসে হাজির। তাও একজন স্যার না, তিন তিন জন স্যার। অগোছালো ভাবে হিস্ট্রি প্রেস্নেন্ট করলাম, নিজের ডায়গনোসিস ও বললাম। স্যাররাও দেখলাম দাগটাকে নিয়ে একটু কনফিউসড। জ্বর আগে না দাগ আগে এই প্রশ্নের উত্তর মহিলা ঠিক ভাবে দিতে পারে না, আবার তার নাকি আগে থেকেই জোড়ায় ব্যথা মাঝেমাঝেই থাকে। এক স্যার হটাত জানতে চাইলেন, এখানে আসলেন কেন? তখন হটাত মহিলা বলে, গতকাল এক ডাক্তার দেখাইসি উনিই প্রেসক্রিপশনে লিখলেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগবে। আমি মাঝ থেকে বজ্রাহত, এতক্ষন পর এই কথা বলতেসে মহিলা! সাথের বেশী কথা বলা মহিলাটা এতক্ষনে এনে সেই প্রেসক্রিপসন স্যারের কাছে দিল, উঁকিঝুঁকি মেরে দেখালাম আমাদের মেডিকেলেরই স্কিনভিডির বড় এক স্যার, স্যারের ডায়গনোসিসও স্টিভেন জনসন সিন্ড্রোম। দেখে নিজের মাঝে একটা আত্মতৃপ্তির বোধ আসলো, যাক চিন্তা ভাবনার লাইনতো ঠিক আছে। স্যাররাও এডভারস ড্রাগ রিএকশন হিসাবে পেসেন্টকে ট্রিট করার সায় দিলেন। রোগিণীর চিকিৎসা হল, সকল এন্টিবায়োটিক বাদ দিয়ে জ্বরের জন্য নাপা সাপোসিটোরি, ফেক্সোফেনাডিন ১৮০গ্রাম, অরাল স্টেরয়েড (স্কিনের স্যারের পরামর্শে), রেনিটিডিন এবং প্রয়োজনে পারএন্টারাল নিউট্রেসন। পরদিন অন্যান্য রোগীদের মতো রোগিণীর রুটিন ইনভেসটিগেসনগুলো (CBC, Urine analysis, Serum Creatinine, RBS etc) হাসপাতালের ল্যাবে পাঠানো হল। রাতে রাউন্ডে গিয়ে যথারীতি প্রায় একই রকম রিপোর্ট দেখলাম সিবিসি নরমাল, ইএসআর একটু বেশী, ইউরিনে কিছু পাস সেল, নো প্রোটিন, নো কাস্ট এরকম রিপোর্ট, সরকারী হাসপাতালের রিপোর্ট যেমন হয়। এদিকে রোগীর লোক আমাদের কথায় গ্রামের ডাক্তার কি ওষুধ দিয়েছিল সেটা এসএমএস করে জোগাড় করেছে। এডভারস ড্রাগ রিএকশন করতে পারে এমন এন্টিবায়োটিক থাকায় আমরা আর ডায়গনোসিস পাল্টানোর কথা ভাবলাম না। ৪/৫ দিন গেলো, রোগীনির কিছুটা ভালো লাগছে। একেতো শীতের সময়, তার উপর হাসপাতালে কেউ থাকতে চায় না। রাউন্ড বা ফলোআপে রোগিণীর পাশে গেলেই তার এক কথা, ওষুধ লিখে ছুটি দিয়ে দিতে। পরে স্যার এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন যেতে চাইলে DOR (ডিসচার্জ অন রিকুয়েস্ট) লিখে ছুটি দিতে। রোগিণী খুশি মনে চলে গেলো, আমরাও ভুলে গেলাম ব্যাপারটা।



সপ্তাহ দুয়েক পর নন-এডমিশন দিনে এডমিশন টেবিলে বসে আছি। রোগিণী আবার হাজির, হাতে ছুটির কাগজটা। তার সিম্পটম আবার দেখা দিয়েছে, কোন কোন ওষুধ আবার খেতে হবে জানতে এসেছে। রোগীর অবস্থা দেখে রোগীকে আবার ভর্তি হতে বললাম, না সে ভর্তি হবে না। ভর্তির বাইরে আমরা কোন রোগীকে কিছু প্রেসক্রাইব করতে পারিনা বলে বহির্বিভাগে আরপির সাথে যোগাযোগ করতে বললাম। ভাবছিলাম আরপি হয়তো তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানাতে পারবে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেই গিয়ে যে সে কই হারিয়ে গেলো আর দেখা গেলো না।
এরও আরও কিছুদিন পর। রোগিণী আবার ভর্তি হল, অন্য একটা মেডিসিন ইউনিটে। এবার সাথে নতুন সিম্পটম, দুদিন ধরে প্রস্রাব প্রায় হয়ই না, রোগিণীর খুব অবস্থা খারাপ। জোড়ায় ব্যথা, মুখে ঘা আর কিডনির সমস্যা সবকিছুকে এক সাথে ফেলে নিগেটিভ সিম্পটমগুলোকে বাদ দিলে একটাই ডায়গনোসিস আসে, লুপাস নেফ্রাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস এরাইথোমেটোসাস (SLE) এর একটা খারাপ প্রেসেন্টেসন। ডায়গনোসিস নিশ্চিত করার জন্য এবার বাইরের ভালো ল্যাবে CBC, Unrine analysis, ANA, anti-ds DNA করার জন্য পাঠানো হল। দুর্ভাগ্য, এসব রিপোর্ট হাতে আসার আগেই রোগিণী মৃত্যুবরণ করেন।

কাজ করে উপলব্ধি একটাই, প্রায় সবসময়ই আপনি যা ভাববেন এটাই সত্যিকারের ডায়গনোসিস। কিছু রোগীর জন্য আপনি কোন ডায়গনোসিস খুঁজে পাবেন না। এরা দ্বার থেকে দ্বার ঘুরবে, কিছু ভালো হয়ে যাবে, কিছু খারাপ। কিন্তু ডায়গনোসিস (মিস-ডায়গনোসিস বলাই ভালো) করা কিছু রোগীর ভাগ্য খারাপের কারনেই হোক, রোগীর নিজের খামখেয়ালীপনার কারনেই হোক অথবা আমাদের কোন ভুলত্রুটির কারনেই হোক, খারাপ কিছু হবে। হয়তো এরকম রোগী ০.০১% এর ও কম। কিন্তু এরাই মনে ১০০% ছাপ রেখে যাবে।

This is why probably we doctors can’t afford to make any mistake, even have to correct the mistake that was not even there.