২৯ জুন, ২০১৪

রমজান ২০১৪



বছরের প্রতিটি সময়ের পিছনে টুকরো কিছু গল্প থাকে। বছর ঘুরে ঐ সময়টা আসলেই সেই গল্পগুলো মনটা দখল করে নিতে চায় জোর করেই। কারো জন্মের মাস ক্যালেন্ডারের পাতায় ভেসে উঠলেই, সে যতই গুরুগম্ভীর মানুষ হউক না কেন ছোটবেলার কথা আবছা ভাবে চলে আসে মনে। রমজান মাসটাই তার কিবা ব্যতিক্রম। 
 


স্কুল বা কলেজ লাইফে রমজান মাসকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার মতো সুযোগ কখনো হয়ে উঠেনি। মাঝেমাঝে বন্ধুদের ইফতার পার্টির দাওয়াত পেতাম, বাস্তব জীবনে চরম অসামাজিক থাকায় প্রায় সব সময়ই অনুপস্থিত থাকা হতো অনুষ্ঠানগুলোতে। এরপর মেডিকেল জীবন, ভর্তির প্রথম বছরে আমাদের আবাসন হিসাবে তখন হোস্টেলের সিট ছেলেদের প্রায় সবার কপালে হয়ে উঠেনি। কলেজ গেটের ওপাশে “সেবা” নামের পাচতালা বিল্ডিংটা ছিল আমাদের এক বছরের আবাসস্থল। ছোটছোট খুপরির মতো রুম, দুজন করে একসাথে থাকা। রমজান মাস আসার আগেই বাসা থেকে সবাই চিন্তিত, খাওয়া দাওয়ার কি হবে। আমাদের খাবার দিয়ে যায় যে খালা উনি আশ্বস্ত করলেন, “মামা, খাওয়াদাওয়ায় কুনু সমস্যা হইব না, আমরা দুপুরে আগের মতোই খাবার দিয়া যামু”। যাই হোক রমজান শুরু হল যথারীতি, নতুন পরিচয় হওয়া কাঁচা বন্ধুদেরকে দেখে খারাপই লাগতো। ক্লাস আর নানান ঝক্কিঝামেলার মাঝে রোজা রাখা এতো বেশ কষ্টের কাজ। চাইতাম, নিজের খাওয়াদাওয়ার কাজটা যতটা পারি ওদের চোখের আড়ালে রাখার। তখন রাতে ঘুমাতাম বেশ সকাল, ঘুম ভাঙ্গত অনেক ভোরে, প্রায়ই রোজাদার বন্ধুদের জাগিয়ে দেয়ার দায়িত্বটা পালন করতাম। এবার অনেকগুলো ইফতার পার্টি চাইলেও পাশ কাটিয়ে যেতে পারিনি বন্ধুদের চাপাচাপিতে।

২য় বর্ষের রমজানটা স্মৃতিতে অনেকটা আবাছা। প্রথম প্রফ পরীক্ষার একেবারেই শেষের দিকে শুরু হওয়া রমজানের কারনে ম্যাক্সিমাম রোজাই বাসায় কাটানো হয়েছে। ততদিনে আমাদের জন্য হোস্টেলের চকচকে নতুন রুম বরাদ্দ হয়েছে। ভাইভার ব্যস্ততায় যে দুই একটা রোজা হোস্টেলে পেলাম, পুরাতন ফ্রেন্ড আর নতুন করে হওয়া রুমমেটদের সাথে একসাথেই।

তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম বর্ষের প্রতিটা রোজার দৃশ্য একই রকম। আর যাই হউক, বন্ধুদের ফেলে খাওয়া যায় না, হোস্টেল লাইফে এটাই শিখলাম। ভোররাতে একজন আরেকজনকে ডেকে ঘুম থেকে জাগানো, একসাথে মিলে ফ্লোরে বসে ইফতার বানানো, অদ্ভুত সব খাবার আইটেম এনে ইফাতারের সময় টেস্ট করা, ড্রিকন্সের বোতল নিয়ে কাড়াকাড়ি করা, কার আনা কোন আইটেম সব থেকে জঘন্য এটা নিয়ে এক জন আরেকজনকে পচানো, কোনদিন দল বেধে ৭ জন মিলে একসাথে প্ল্যান করে বাইরে ইফতার করতে যাওয়া এসব প্রতি বছরের দৃশ্য। দেখতে দেখতে কেউ এক্সপার্ট হয়ে গেলো ট্যাং-এর প্যাক পানি গুলে ড্রিঙ্কস বানাতে, কেউ লেবুর শরবত বানাতে, কেউ কাঁচামরিচ আর পেয়াজ কাটাকাটিতে। শাকভর্তা, হালিম, খিচুড়ি, মিষ্টি, বার্গার, চপ, দই, কুমিল্লার কোন লতাপাতা বাকি ছিলনা আমাদের খাওয়াদাওয়ার মেন্যু থেকে। কখনো ইফতার নিয়ে একজনের সাথে আরেকজনের মনমালিন্য, তো আরেকজন গিয়ে মধ্যস্ততা করে সেটা মিটিয়ে আসা। কখনো কে আজকে ইফতার কিনতে যাবে এটা নিয়ে রাগবিরাগের খেলা। কিন্তু দিনের শেষে আমরা কজন, একসাথে। কখনো হিন্দু মুসলিম এই বিভেদে পড়তে হয়নি, এমনকি আমি কি খাই না খাই এটা ভেবেও ওরা ইফতার বাজার করতে যেত। বাইরের সবাইকেই এই বন্ধুত্বটা বুঝানো খানিকটা কষ্টের ছিল, কিন্তু এই কষ্টটার মাঝেও স্বস্তির কিছু ছিল গত বছরগুলো ধরে।

গতবছর ইন্টার্নী লাইফে ঢুকে সবাই অনেক ব্যস্ত, কিছু বন্ধুর তখন প্রফ ক্লিয়ার হয়নি। তারপরেও তখন বিদায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেনি রমজান মাসে। যতটুকু সম্ভব কাছাকাছিই ছিলাম সবাই সবার। এই বছরটাই প্রথম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলো বিদায় ধ্বনি।
কাছে হোক বা দূরে হোক, একজনের স্মৃতিতে আরেকজন আছি, সান্ত্বনা এটাই। সবাইকে রজমানের শুভেচ্ছা রইল।