০৩ মে, ২০১৪

একজন সার্জনের অভিজ্ঞতা (সংগ্রহীত)

ও পুত দরজার সামনে গাড়ী খারাই রইয়ে ।
তখন চট্যগ্রামে থাকি । মধ্যরাত্রি পেরিয়ে গেছে ,বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি, শো শো বাতাস ,দুরে কোথাও বাজ পডার শব্দ ,এরি মাঝে ক্লিনিক থেকে কল এসেছে যাবার জন্য । সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে বললে এমন একজনার নাম বলল , না গিয়ে উপায় নেই । তাড়াতাড়ি যাবার জন্য প্রস্তুত হতে হতে এম্বুলেন্স বাসার সামনে উপস্তিত । মাথায় ছাতা ধরে এম্বুলেন্সে উঠে বৃষ্টির পানিভরা রাস্তার বুক চিরে ক্লিনিকে পৌছে গেলাম । এত গভীর রাতেও ক্লিনিকের রিসেপসন অনেক লোকজন দিয়ে ভরা ,আমাকে আশা জাগানিয়া চোখে দেখছে যেন সমুদ্রমাঝে হাল ধরার আমিই নাবিক । ক্লিনিকের বাগানের গাছগুলো বৃষ্টিতে ভিজছিল যেন এইজন্যই তারা এখানে আছে ,বাইরে কোনকিছু দেখা যায়না শুধু অন্ধকার ।
ইমারজেন্সির ঘোলাটে আলোতে অনেক লোকের ভীড়ে রোগী শুয়ে আছেন ,মানুষ সরিয়ে দেখলাম সে আমার দিখে ডুবন্ত চোখে চেয়ে আছেন ।নাম মোহাম্মদ আলী ,পেশায় ট্রাক ড্রাইভার ,একজন মন্ত্রীর খাসলোক । কিছুক্ষন আগে বৃষ্টির মধ্যে ট্রাক চালনোর সময় আর একটি ট্রাকের সাথে মুখুমুখি সংঘর্ষে স্টিয়ারিং হুইলের চাপে আটকে ছিল । দরজা কেটে বের করা হয়েছে । হাত ,পা, বা মাথায় আঘাত লাগেনি । শরীরের বাইরে কোন আঘাতের চিন্নহ নেই । তার নাড়ীর স্পনদন নেই ,রক্তচাপ শুন্যের কোটায় ,শ্বাসপ্রশ্বাস শুনা যায়না -মনে হয় জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে আছে । মুহুর্তেই বুঝে গেলাম ইনটারনাল ব্লিডিং হচ্ছে ,শকে আছে । বাইরে বেরিয়ে রক্তের কথা বলাতে সবাই লাইনে দাড়িয়ে আমারটা নেন ,আমারটা নেন বলে বলে শোরগোল উঠে । এদের মধ্যে চার ব্যাগ এ বি পজিটিভ এবং মেচ করে দিয়ে দেবার পরে,আরো লাগবে বলাতে ঐ বৃষ্টির মধ্যেও ট্রাকে করে শ'খানেক ট্রাক ড্রাইভার ,হেলপার হাজির । আরো চার ব্যাগ দেবার পর একটু একটু শিরার স্পন্দন এবং রক্তচাপের উন্নতি হয় -দুএকফোটা পেছাবের মুক্তি হয় । দুরে কোথাও সুমধুর আজানের ধ্বনি শুনা যাচ্ছিল । ঘরওয়ালী ফোন করে বাসায় কবে আসব ? জানতে চাইলে পরিস্থিতি জানিয়ে মোহাম্মদ আলীর নিবিড় পর্যবেক্ষনে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে যাই । মেঘের ঘোমটার আড়ালে তখন পুবাকাশে সুর্যের আলোর বিকিরন হচ্ছে ।
সকালে রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে ,ই সি জি এবং পেটের আল্ট্রাসনগ্রাফি করলে লিভার ছিড়ে যাওয়া নিশ্চিত হয় । এতবড় অপারেশন ,তাও আবার মন্ত্রীর লোক ভেবে ঝামেলার কথা ক্লিনিক মালিককে জানালে সেও দুমনায় পড়ে যায় । একটু পরে মন্ত্রীর এ পি এস আমাকে ফোন করে এখানেই অপারেশনের জন্য বললে টেনশন আরো বেড়ে যায় । বাইরে শতশত লোক ।অনেক সময় দেখেছি রক্তের কথা বললে অনেকে সটকে পড়ে ,আজ দেখছি লোক আর ও বাড়ছে "স্যার রক্তের কোন অভাব নেই আমাদের আলী ভাইরে বাচান" । অপারেশনের সময় নিজে ঠিক থাকার জন্যে নাস্তা সেরে নিলাম , কিন্তু গলা দিয়ে পানির ঢোকের সহায়তা নিতে হল । "সাহসের সাথে উপস্থিত বুদ্বির রসায়ন দিয়ে পাড়ি দিতে হবে "ভেবে লম্বা শ্বাস নিতে থাকলাম ।
অপারেশন টেবিলে মহাম্মদ আলীকে খালী গায়ে দেখে মুষ্টিযোদ্বা আলীর কথা মনে পড়ে গেল ,এও দেখি সেরকম সুগঠিত ;খেটে খাওয়া ট্রাক ড্রাইভার বলে কথা । এনেস্থেসিয়া দেবার পর তার রক্তচাপ আরো কমে গেলে অন্য একটি চ্যেনেল করে রক্ত দেয়া শুরু হয় । রক্তচাপ একটু বাড়লে পেট খুললে ছোপ ছোপ রক্ত আমাকে এবং সামনের সহকারিকে ভিজিয়ে দেয় , রক্তের বোতল চেপে ও রক্ত ঢুকানো হয় , আরও রক্ত দেয়া লাগে । সব রক্ত পেট থেকে বের করে দিয়ে লিভারে হাত দিয়ে নিজেই ঝিম ধরে গেলাম ,কারন এটা একেবারে উপরের দিকে যেখানে আমার সেলাই পৌছানো অসম্ভব । হাত দিয়ে চেপে ধরলে বন্ধ হয় ,হাত আলগা করলেই গলগল করে বের হয় ,প্রেশার কমে যায় । তখন মনে হচ্ছিল "কেন সার্জারিকে কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম " । অনেকক্ষন চেপেধরে, কয়েকবোতল রক্ত তাড়াতাড়ি দিয়ে রক্তচাপ বাড়িয়ে ঠায় দাড়িয়ে রইলাম ,কেউ কথা বলছেনা ,শুধূ এ সির শব্দ , আবার চাপ সরালে গলগল রক্ত - নাহ আজ আর কেউ তাকে বাচাতে পারবেনা । তখন অফিস টাইম শুরু হয়ে গেছে ,দুএকজন সার্জারীর কলিগদের আসার জন্য ফোন করলে অপরাগতা জানিয়ে দিল । শেষে আমার অধ্যাপককে ফোন করলাম ,উনি থোরাকোটমির পরামর্শ দিলেন ,কিন্তু এনেস্টেটিস্ট রিস্কি বলে অসম্মতিতে মাথা জাকাল । শেষে অনেকগুলো জেলফোম দলা পাকিয়ে ছেড়া জায়গায় ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে রইলাম প্রায় ৩০ মিনিট , ভয়ে ভয়ে আলগা করলে দেখি রক্ত পাত কমে গেছে , আর ও খানিক্ষন চাপ দেয়ার পর দেখি বন্ধ হয়ে গেছে । পরে ড্রেন দিয়ে চলে আসি। পরের দিন দেখতে গেলে দেখি মুচকি মুচকি হাসছে ;ভাবলাম বোধ হয় এ যাত্রা বেচে গেছে ।
তিনদিন ভাল থাকার পর হঠাত তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে একটি মেডিকেল বোর্ড করা লাগে । বুকের এক্স-রেতে দেখা যায় ,বুকের ডান পাশে পানি জমে ভরে গেছে । বোর্ডের সিদ্বান্ত অনুযায়ি ইন্টারকস্টাল টিউব দিলে দেখি পিত্তরস আসে , শ্বাসকস্ট সামান্য লাঘব হয় ।পিত্তরস আসার কারন হল লিভারের সাথে সাথে ডায়াফ্রাম ছিড়ে গিয়ে চেস্টের সাথে যোগাযোগ হয়ে যাওয়া । চটগ্রামে তখন চেস্ট সার্জন না থাকাতে তাকে ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পাঠালে তারা ব্রঙ্কুপ্লুরাল ফিশটুলাটি বন্ধ করে দিলে সে ভাল হয়ে যায় । পরে ইন্সিসনাল হার্নিয়া হলে আমরাই ঠিক করে দেই ।
দুই বছর পর আমি তখন কুমিল্লাতে দোতলা বাসা কাম চেম্বারে রূগী দেখি ,ডায়বেটিসের জন্য আমার মা বারান্দায় হাটেন । হঠাত একটি ট্রাকের হুইসেল , দেখি গাড়ীটি আমাদের বাসার উঠানে এসে থেমেছে । আমার মা বলে উঠলেন "ও পুত দরজার সামনে গাড়ী খারাই রইয়ে "।
সিড়িতে দেখলাম মোহাম্মদ আলী উঠে আসতেছে ,হাতে দুটি বিশাল ইলিশ । "স্যার চাদপুর গেছিলামতো ,দুটো বড় পেলাম ,ভাবলাম আপনার জন্য নিয়ে আসি "আলীর গমগম কন্ঠের সহাস্য উচ্চারন ।
সেদিন রাতে আমাদের বাসাটি খটি ইলিশের সুগন্দ্বে ভরে গেছিল ,মা ও মোহাম্মদ আলীকে না খাইয়ে ছাড়েনি ।
------------------------------------------------------------------------------------------------



স্যার বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ইউরোলজী বিভাগে প্রফেসর হিসাবে কর্মরত আছেন।